মালহামা বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা শেষ জামানার ভয়াবহ যুদ্ধে মজলুম মুসলমানদের বন্ধু কারা সেটি অনেকেই ইতিমধ্যে জানেন। কারণ ভূরাজনীতিতে ইতিমধ্যে এক ধরনের মেরুকরণ হয়ে গেছে। তবে এখনও ধোঁয়াশা আছে। যাদের মনে করা হচ্ছে মিত্র, দিন শেষে সেটি নাও হতে পারে। যাদের মনে করা হচ্ছে মজলুম মুসলমানদের পাশে থাকবে কিন্তু দিনশেষে বাস্তবতা ভিন্নও হতে পারে। সম্প্রতি ছোট্ট একটি অনলাইন জরিপ করে বুঝতে পারি যে অনেকেই এ সম্পর্কে ভালো ধারনা রাখেন। তবে জরিপটি সংশ্লিষ্ট গ্রুপে ছিল যা থেকে সামগ্রিক চিত্র বোঝা সম্ভব না। কারণ এর বাহিরে বহু মানুষ বেখবর। চারপাশে যুদ্ধের দামামা শুরু হয়ে গেছে সে সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই কোন খবর রাখেনা। সম্ভাব্য ভয়াবহ যুদ্ধ সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ যেখানে গাফেল সেখানে মজলুম মুসলমানদের মিত্র কারা সে আলোচনা বারাবারি মনে হতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা জানে শকুন দরজায় কড়া নাড়ছে। শীঘ্রই হয়ত এসব বিষয় পড়ার মতো অবস্থা আর নাও থাকতে পারে। তাই শত্রু মিত্র চিনে রাখার এখনই সময়।
শত্রু-মিত্র চেনার উপায়
বিশ্ব দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে বলা যায় যার একটি পশ্চিমা শক্তি অপরটি পশ্চিমা বিরোধী। এখন শুধু ভাসমান ও দুই নৌকায় পা দিয়ে থাকা শক্তিগুলোর মেরুকরণের পালা। এই দুটি পক্ষই ধীরে ধীরে অন্ধকার এবং আলোর শক্তি হয়ে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। এখানে কেউ যদি ভাবে যে, আপাতত পশ্চিমাদের সুবিধা আদায় করে পরে সুযোগ বুঝে সরে যাওয়া যাবে, এটা ভুল। কারা তাদের পক্ষে যাবে কারা বিরুদ্ধে যাবে এটা বাছাইয়ের চূড়ান্ত সময় এখনই। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেমন তেমনি নিজেদের অগোচরেই ব্যক্তি পর্যায়েও এই বাছাই পর্ব চলছে। একটু ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে চারপাশ খেয়াল করলেই দেখবেন সম্প্রতি আমরা ভিনদেশী নানারকম এজেন্ডা দ্বারা বিভক্ত হয়ে যাচ্ছি। এটা আবাহনী-মোহামেডান, আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিভাজন না। আমরা এলজিবিটিকিউয়ের পক্ষে বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছি। নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে বিপক্ষে। ইনক্লুসিভ শব্দের পক্ষে বিপক্ষে। ফিলিস্তিন নিয়ে আমরা বিভক্ত হয়ে গিয়েছি। সব জেনেবুঝেও ফিলিস্তিন নিয়ে যারা নিরব তারা আসলে নেতানিয়াহুর পক্ষ নিয়েছে। যদিও লোকলজ্জার কারণে তাদের অবস্থান এই মূহুর্তে স্পষ্ট করার মানসিক শক্তি নাই। কিন্তু বিভাজনটা তৈরি হয়ে গেছে। সময় সুযোগ বুঝে স্পষ্ট হবে। এভাবে সকল ধর্মের সমন্বয়ে নতুন এক ধর্মকে হাজির করার মহাপরিকল্পনা চলছে যার পক্ষ বিপক্ষ শ্রেণী তৈরি হবে। এই এজেন্ডাগুলোই আসলে ব্যক্তিপর্যায়ে আমাদেরকে দুটি দলে বিভক্ত করে ফেলছে যা ধীরে ধীরে প্রকট আকার ধারন করতে যাচ্ছে।
অনেকে মনে করেন ইহুদি জায়োনিস্ট ও তাদের সমর্থক পশ্চিমা শক্তিই বুঝি মজলুম মুসলমানদের একমাত্র শত্রু। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সম্প্রতি একটি কথা শোনা যায় যে, জায়োনিস্ট হওয়ার জন্য ইহুদি হওয়ার দরকার নাই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও বলেন “জায়োনিস্ট হতে হলে আপনাকে ইহুদি হতে হবে না”। সত্য এটাই যে, বহু মুসলিম জায়োনিস্ট আরব বিশ্বসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যারা ছদ্মবেশী এবং যাদের অবস্থান সরাসরি মজলুমদের বিরুদ্ধে। এছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীরাতো আছেই। আর তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থক বা সুবিধাভোগীরা আছে আমাদের চারপাশে যারা কেউই অন্তত মজলুমদের বন্ধু হবে না।
শত্রু-মিত্রের পার্থক্য করার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হলো এলজিবিটিকিউ। কারন এটি মহাপরিকল্পনার একটি অংশ। রাষ্ট্র, গোষ্ঠী, সংগঠন থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই মতবাদের হয়ে কাজ করলে, সমর্থন করলে, জেনেও কোন প্রতিবাদ না করলে তার অবস্থান সুস্পষ্টভাবে অন্ধকারের পক্ষে। যদিও এটিকেই তারা বলবে ডাইভার্সিটি, মানবাধিকার, আধুনিকতা, এটাই নাকি আলোর পথ! হিউমান রাইটস ওয়াচের মতে বিশ্বে ৬৩টি দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমকামীতা বেআইনি। এগুলো বেশিরভাগই মুসলিম দেশ। কিন্তু এর ভিতরও অনেক রাষ্ট্রযন্ত্র আছে যার মাধ্যমে মুসলিম দেশেও পরোক্ষভাবে এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কাজেই কোন আরব শাসক যদি তলে তলে এর সাফাই গায় তবে তাদেরকে মজলুমদের বন্ধু ভাবার কোন কারণ নাই।
মেরুকরণের শুরুতে অনেক দেশই পরাশক্তিদের চাপে তাদের মতো করে চলতে বাধ্য হতে পারে। কারণ সামরিক বাহিনীগুলো নিয়ন্ত্রিত থাকবে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে যেভাবে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে তা হলো প্রথমে দেশে দেশে গৃহযুদ্ধ দিয়ে শুরু হয়ে তা আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং সবশেষ মহাযুদ্ধে রূপ নিবে। পরিস্থিতি ও সময়ের ব্যবধানে বদলে যেতে পারে শত্রু মিত্রের সমীকরণ।
চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য দেশে দেশে ছদ্মবেশী শাসক গোষ্ঠী বসানো হয়েছে যারা প্রত্যেকে এক এবং অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এদের চিহ্নিত করা সবার জন্য একটু কঠিন কাজ। তিনটি লক্ষণ শেয়ার করছি যেগুলো দেখলে চোখ বন্ধ করে ধরা যায় সে মজলুমদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ময়দান প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত আছে। ১. এলজিবিটিকিউ নিয়ে প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে সক্রিয় থাকা ২. ইনক্লুসিভ সমাজ গঠন ৩. ধর্মকে ব্যবহার করা (বিশেষ করে মুসলিম দেশে)। উল্লেখ্য, ইনক্লুসিভ শব্দের মধ্যে যেহেতু ভালো ও মন্দের মারপ্যাঁচ আছে কাজেই এটি নিয়ে গোপনে কাজ করার প্রয়োজন নেই। কোন প্রশ্ন উঠলেই এই শব্দের এক ডজন ভালো অর্থ হাজির করা যায়। কিন্তু ধর্ম এবং এলজিবিটিকিউ স্পর্শকাতর বিষয় জন্য ছদ্মবেশ ধারন করতে হয়। এক নজরে নিচের পয়েন্টগুলো ধরে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে:
▪ বলার অপেক্ষা রাখে না, ইহুদি জায়োনিস্ট এবং পশ্চিমা জোট মজলুম মুসলমানদের বন্ধু না। আবার পশ্চিমা বিরোধী দেশ মানেই বন্ধু ভাবারও কোন কারণ নেই।
▪ এ সময় মজলুমদের শত্রু চেনার অন্যতম হাতিয়ার এলজিবিটিকিউ।
▪ পশ্চিমা সমর্থিত এবং তাদের সুবিধাভোগী আরব শাসকরা মজলুমদের বন্ধু না।
▪ পশ্চিমে হেলে থাকা নামধারী দেশী ও বিদেশী ইসলামী সংগঠনগুলো কখনও মজলুমদের বন্ধু হবে না। তবে এসব সংগঠনের বিশেষ করে অধঃস্তন পর্যায়ে অনেক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ আছে যারা হয়ত ফিরে আসবে মজলুমদের কাতারে।
▪ বহু সশস্ত্র বাহিনী মজলুমদের বন্ধু হয়ে লড়াই করছে এমনটা শোনা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের পিছনে অন্য শক্তি কাজ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা প্রক্সি বাহিনী। বন্ধু ভাবার আগে তাদের অর্থের উৎস সম্পর্কে জানা উচিত।
▪ সুবিধা নেয়ার বিনিময়ে পশ্চিমা ধ্যান-ধারনাকে লালন করে ও প্রচার করে আবার ইসলামিক কাজেও নিয়োজিত আছে এমন মানুষ আর যাই হোক মজলুমদের বন্ধু হতে পারে না। এরা সুবিধাবাদী।
▪ দেশে দেশে ছদ্মবেশী শাসক গোষ্ঠী বসানো হয়েছে যাদের কাজ চূড়ান্ত পরিস্থিতি সামাল দেয়া। এরা খেলার পুতুল। এরা ভয়ংকর। এরা বন্ধুর বেশ ধারন করে আছে। এদেরকে বন্ধু ভাবা চরম বোকামী।
▪ একদল কর্মী বাহিনী প্রস্তুত করা হয়েছে। ধারনা করি, এরা ২ থেকে ২০ বছরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর এই বাহিনী বন্ধু বেশে জায়োনিস্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করে যাচ্ছে। রাজনীতি, ধর্ম, এলজিবিটিকিউ, অর্থনীতি, মিডিয়া, সামরিক সব সেক্টরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের আরেকটি পরিচয় হলো ‘সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার’। আন্দোলন, বিপ্লবে এদের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানো হয়। কোন ঘটনা ঘটার সাথে সাথে জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি লক্ষ্যের অনুকুলে নিয়ে আসে। এ ধরনের বন্ধুরূপী শত্রু থেকে সাবধান।
▪ পশ্চিমা মতাদর্শ বিরোধী এক পক্ষ আছে যারা মজলুমদের কথা বলে কিন্তু অবিশ্বাসী। এরা এখন চরম দোটানায়। পশ্চিমেও যেতে পারেনা আবার বিশ্বাসীদের কাতারেও আসতে পারে না। বাম সমর্থকরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। হয়ত তারা ফিরে আসবে। ক্ষেত্র বিশেষে নির্ভর করবে এরা মজলুমদের বন্ধু নাকি শত্রু।
এবার মজলুম মুসলমানের শত্রু-মিত্র নির্ধারনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায় এমন কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে।
রোমান-মুসলমান সন্ধি
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত ছিল এই সন্ধি চুক্তি। কারণ এ ধরনের চুক্তি সংক্রান্ত ঘটনার পরিক্রমার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস নামে যে চুক্তিগুলো হয়েছে এবং বিশেষ করে বিভিন্ন মুসলিম দেশে আরো যেসব চুক্তি হচ্ছে, হতে যাচ্ছে সেগুলো নিয়ে এস্কেটোলজি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু তার লেশমাত্রও কোথাও দেখা যায় না। রাতভর ওয়াজ মাহফিলের আলোচনায় নাই। কোন বিশ্লেষণে নাই। লাইভ ভিডিওতে নাই। বরং বাস্তবতা হলো মুসলমানদের থেকে খ্রিষ্টানরা এই আলোচনায় বেশি সরব। গবেষক, আলেম সমাজ, ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের এটি নিয়ে ভাবার সময় এখনই। এখানে আমার কিছু ভাবনা শেয়ার করে রাখছি। হাদিসটি অনেকের জানা। তারপরও লেখার ধারাবাহিকতায় উল্লেখ করছি।
“অদূর ভবিষ্যতে তোমরা রোমানদের (খ্রিস্টানদের) সাথে শান্তি চুক্তি করবে। পরে তোমরা ও তারা মিলে তোমাদের পিছন দিককার শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবে। সেই যুদ্ধে তোমরা জয়ী হবে, গনিমত অর্জন করবে এবং নিরাপত্তা লাভ করবে। অবশেষে তোমরা ফিরে এসে একটা উঁচু সবুজ-শ্যামল ভূমিতে আশ্রয় নেবে। তখন এক খৃষ্টান ব্যক্তি ক্রুশ উঁচিয়ে ধরে বলবে, ক্রুশ জয়ী হয়ে গেছে। ফলে মুসলমানদের এক ব্যক্তি তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে ক্রুশটিকে ভেঙ্গে ফেলবে। এই ঘটনার সুত্র ধরে রোমানরা বিশ্বাসঘাতকতা (সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ) করবে এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে।”
“তখন রোমানরা তাদের রাজাকে বলবে, আরববাসীদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে আমরাই যথেষ্ট। ফলে তারা যুদ্ধের (মহাযুদ্ধের) জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং তারা আশিটি পতাকার তলে সমবেত হবে। আর প্রতিটি পতাকার তলে বারো হাজার করে সৈন্য থাকবে।”
আল ফিতানের এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, “তোমরা রোমানদের (খৃষ্টানদের) সাথে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হবে। এরপরে তোমরা একত্রে ‘টার্কস’ (বর্তমান রাশিয়া) এবং কারমান (ইরানের একটি প্রদেশ) আক্রমণ করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে জয়ী করবেন”।
আল ফিতানের অপর বর্ণনায় আছে, “তোমরা দশ বছরের জন্য (কোনও বর্ণনায় এসেছে সাত বছর) রোমানদের সাথে সন্ধি চুক্তি করবে। তোমরা এবং রোমানরা মিলে কুস্তুন্তুনিয়ার পেছনের দিককার শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবে। যুদ্ধ শেষে ফেরার সময় তোমরা কুস্তুন্তুনিয়া দেখতে পাবে। এবার তোমরা এবং রোমানরা মিলে কুফা নগরী আক্রমণ করবে এবং একে ধ্বংস করে ফেলবে। এরপরে তোমরা এবং রোমানরা মিলে পূর্বের কিছু এলাকা (বর্তমান ইরান) আক্রমণ করবে”।
তবে অপর এক হাদিসে রোমানদের সাথে মোট ৪টি চুক্তি সাক্ষরিত হওয়ার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়।মহানবী (সঃ ) থেকে বর্ণিতঃ তোমাদের ও রোমানদের মধ্যে ৪ টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।এগুলোর ৪নং হিরাক্লিয়াসের বংশের এক ব্যাক্তির সাথে হবে এবং তা ২ বছর টিকে থাকবে ।
হাদিস থেকে কয়েকটি মূল বিষয়ের তালিকা তৈরি করা হলো-
▪ রোমানদের সাথে মুসলমানদের চুক্তি
▪ শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তি (নাম বা ধরন)
▪ চুক্তির মেয়াদ ৭/১০ বছর
▪ একটি না বরং একাধিক চুক্তি হতে পারে
▪ সন্ধি চুক্তির পর রোমান ও মুসলমান একত্রে মুসলমানদের পিছন দিককার শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে।
▪ চুক্তি বাতিল এবং মুসলমানদের সাথে রোমানদের চূড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষণা
এখান থেকে কয়েকটি প্রশ্ন নির্বাচন করা যাক যেগুলোর উত্তর খুজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে উৎস থেকে মজলুমদের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত হবে এটি হলো তার ভিত্তি।
১. হাদিসে উল্লেখিত রোমান বলতে বর্তমানে কাদেরকে বুঝায়? পশ্চিমা সভ্যতা নাকি রাশিয়া?
২. হাদিসে উল্লেখিত পিছন দিককার শত্রু বর্তমানে কারা?
৩. উল্লেখিত শান্তি চুক্তি কি হয়ে গেছে, চলমান আছে নাকি এখনও হয়নি? হয়ে থাকলে সেটি কোনটি?
রোমান বর্তমানে কারা?
রোমানদের সাথে মুসলমানদের শান্তি চুক্তি ও চুক্তি ভঙ্গ হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। কাজেই এই রোমানরা বর্তমানে কারা সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিন্ধান্তে আসা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিশ্চয় অনুধাবন করা যায়। প্রাচীনযুগে রোম শহরকে কেন্দ্র করে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সেটিকে রোমান সভ্যতা বলা হতো। মধ্যযুগে এসে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য পতনের পর পূর্ব রোমান অর্থাৎ বাইজেন্টাইনদের রোমান সাম্রাজ্য বলা হতো যাদের রাজধানী ছিল কনস্টান্টিনোপল। হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সময়ে খ্রিষ্টান রোমান বলতে এই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে বুঝাতো। এ পর্যন্ত কারো কোন দ্বিধা নেই। বিতর্ক শুরু হয় বর্তমানে এই রোমান বলতে কাদেরকে বুঝায় তা নিয়ে। কেউ বলেন পশ্চিমা সভ্যতা, কেউ বলেন রাশিয়া। এই দ্বিধাবিভক্তির অবসান হোক। কারণ কোনভাবে এটি চিহ্নিত করতে ভুল হলে উপরের হাদিস থেকে শত্রু-মিত্র খুজে বের করতেও মারাত্নক ভুল হবে। অর্থাৎ শত্রু-মিত্রের পুরো সমীকরণই ভুল হবে।

বিভিন্ন আলোচনা থেকে এ তালিকায় দুটি নাম ঘুরেফিরে আসে। ১. পশ্চিমা সভ্যতা ২. রাশিয়া। এছাড়া পশ্চিমা অনেক বিশ্লেষক গগ ও ম্যাগগ (ইয়াজুজ ও মাজুজ) বলতেও এই দুটি নাম উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু রাশিয়া যদি সেই খ্রিষ্টানদের দেশ হয়ে থাকে যাদের মধ্যে দরবেশ আছে, যারা অহংকার করেনা তবে এই তালিকা থেকে তারা একবাক্যে বাদ হয়ে যায়। কারণ পবিত্র কোরআনে (সূরা মায়েদাঃ ৮২) বলা হয়েছে মুসলমানরা এক শ্রেণীর খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী পাবে এবং অধিকাংশ বিশ্লেষক একমত যে এই শ্রেণীর খ্রিষ্টান হলো বর্তমান রাশিয়া। কিন্তু যাদের সাথে বন্ধুত্ব হবে তারাই আবার শত্রু হবে এমন কথা বলা নেই। আর উক্ত হাদিস অনুযায়ী চুক্তি ভঙ্গ হয়ে চরম শত্রু হবে বর্তমান রোমানরা। অতএব যে রোমানদের সাথে শান্তি চুক্তি হবে ও ভঙ্গ হবে তারা হলো বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতা। থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যা অনুযায়ীও পশ্চিমা সভ্যতাকে বর্তমান রোমান সাম্রাজ্য হিসেবে ধরা হয় যার কেন্দ্র বর্তমান ভ্যাটিকান সিটি। কারণ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে খ্রিষ্টানরা ছড়িয়ে পরেছিল যাদের একটি অংশ এখন অভিন্ন বলয়ের মধ্যে একত্রিত। ধর্ম, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, সামরিক সব ক্ষেত্রে তারা একত্রিত। ভ্যাটিকান সিটি, ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বহু জোট ও ইস্যুর মাধ্যমে তারা একত্রিত। এদের মধ্য থেকে অর্থোডক্স খ্রিষ্টানরা বিভক্ত হয়ে গেছে যারা বর্তমান রাশিয়ার মস্কো কেন্দ্রিক। উভয়ের মধ্যে বড়দিন উদযাপন থেকে শুরু করে ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে তফাৎ আছে। সুতরাং হাদিসে বর্ণিত রোমানরা হলো বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতা। এই রোমানদের সাথেই মুসলমানদের চুক্তি ও চুক্তি ভঙ্গের বিষয়ে বলা হয়েছে।
কিন্তু অনেকের মধ্যে এই ধারনা গেঁথে গেছে যে, রোমানরা হলো বর্তমান রাশিয়া এবং রাশিয়ানদের সাথে চুক্তি হয়ে পশ্চিমাদের সাথে লড়াই করবে, পশ্চিমারা পরাজিত হয়ে রাশিয়া আবার সেই চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করবে। বহু মানুষ এই ধারনা পোষণ করেন। নিজেও তাই জানতাম। বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিশ্চিত হই যে রোমানদের সাথে শান্তি চুক্তি হবে তারা হলো বর্তমান পশ্চিমা জোট। আর যাদের সাথে বন্ধুত্ব হবে তারা হলো অর্থোডক্স খ্রিষ্টান। এখানে হাদিসে উল্লেখিত চুক্তি আর পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত বন্ধুত্ব দুই জিনিস। দুটি ঘটনা খ্রিষ্টানদের দুই শ্রেণীর সাথে ঘটার ব্যাপারে উল্লেখ আছে।
আশা করি দ্রুত বিতর্কের অবসান ঘটবে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো আবারো উল্লেখ করছি:
– পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত বন্ধুত্ব ভেঙ্গে যাবে এমন কথা বলা নেই। যদি জেনে থাকি রাশিয়ানদের বন্ধুরূপে অধিকতর নিকটবর্তী পাওয়া যাবে তবে তা সময় বা পরিস্থিতির কারণে শত্রুতে পরিণত হবে না।
– হাদিস অনুযায়ী যদি রাশিয়ানদের রোমান হিসেবে ধরা হয় তবে তাদের সাথে সন্ধি হওয়ার পর ভেঙ্গে যাবে এবং ভয়াবহতম যুদ্ধ করবে মুসলমানদের সাথে। কিন্তু অধিক বন্ধুরূপে পাওয়ার পর যুদ্ধ হবে কেনো? এটি সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক বিশ্লেষণ।
– বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে একদল খ্রিষ্টান এখন একত্রিত যারা হলো পশ্চিমা সভ্যতা। হাদিসে উল্লেখিত রোমান যদি এই খ্রিষ্টান শ্রেণী হয় তবে কোরআন ও হাদিস উভয় ব্যাখ্যা ঠিকঠাক থাকবে। বর্তমান রোমান অর্থাৎ পশ্চিমাদের সাথে শান্তি চুক্তি, চুক্তি ভঙ্গ এবং যুদ্ধ। আর রাশিয়ান খ্রিষ্টানদের সাথে বন্ধুত্ব।
– রাশিয়ানরা রোমান হলে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তিকে কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে জানা নেই। যেই চুক্তি পশ্চিমাদের সাথে মুসলমানদের ইতিমধ্যে হয়েছে এবং মূল যে চুক্তিটি সৌদি আরবের সাথে হওয়ার কথা তার পক্রিয়া চলমান আছে। যা হাদিসে বর্ণিত সন্ধি চুক্তির সাথে সম্পূর্ণ সাদৃশ্যপূর্ণ।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ও রোমান-মুসলমান চুক্তি
সংক্ষেপে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য করা একাধিক চুক্তির সমষ্টি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততায় এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, শান্তি ও সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পর্যটন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এর রহস্য লুকিয়ে আছে অন্যখানে। এটি নিয়ে পর্যালোচনা করতে গিয়ে খুজে পাই যে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো হাদিসে উল্লেখিত রোমান-মুসলমান শান্তি চুক্তি যা নিয়ে অপর একটি লেখায় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহু আলম।
মজলুম মুসলমান ও রাশিয়ার বন্ধুত্ব
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে একটি ইন্টারপ্রিটেশন শেয়ার করে আসছি অনেক দিন হলো। এখানে আবার শেয়ার করছি। শত্রু-মিত্র সম্পর্কে সিন্ধন্তে আসতে সহায়ক হবে আশা করি। সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় বিশ্লেষণ সাপেক্ষে ব্যক্তিগতভাবে এটি নিয়ে সিন্ধান্তে পৌছায়, বাকিটা নিশ্চয় আল্লাহু আলম। এছাড়া বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ সাপেক্ষে আরো অনেকে এমন মতামত দিয়েছেন। সেদিক বিবেচনায় কেউ চূড়ান্ত হিসেবে না ধরলেও অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
বিষয়টির সারমর্ম হলো “জায়নবাদীদের পতন হবে রাশিয়ানদের হাতে আরো সুনির্দিষ্টভাবে এটি হবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে। তার সাথে থাকবেন মুসলিম লিডার/প্রতিনিধি।” ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আল আকসা মুসলমানরা কখনও রক্তপাতের মাধ্যমে জয় করেনি। প্রথমবার হযরত উমর (রা.) এবং দ্বিতীয়বার সালাউদ্দিন আইয়ুবী আল আকসা জয় করেন। কোনবারই আল আকসা জয়কে কেন্দ্র করে রক্তপাতের কোন নজির নেই। তৃতীয়বার সেই সুসংবাদ আসলে সেখানেও কোন রক্তপাত হবে না ইন শা আল্লাহ। এটা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সময়। জায়োনিস্টদের থার্ড টেম্পল তৈরি হলে তা বরং ধ্বংস হতে পারে অন্য কারো দ্বারা। এক্ষেত্রে রাশিয়া ছাড়া আর কাকে চোখে পরে?
এবার মূল আলোচনায় আসি। কথায় আছে শত্রুর শত্রু হলো বন্ধু। রাশিয়া ও নির্যাতিত মুসলমানদের ক্ষেত্রে এটা পুরোপুরি সত্য। দীর্ঘদিন ধরে একঘরে হয়ে থাকা রাশিয়া ও নির্যাতিত মুসলমানদের শত্রু এক। দীর্ঘদিন ধরে যে গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতিত হয়ে আসছে মুসলমানরা সেই একই গোষ্ঠী কর্তৃক কোণঠাসা হয়ে আছে রাশিয়ার মতো পরাশক্তি। ন্যাটোর জন্মই হয় মূলত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোণঠাসা করার জন্য। সামরিক, বাণিজ্যিক সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তাদের ঘাড়ে আছে প্রায় ৩০ হাজার নিষেধাজ্ঞা। এতকিছুর পরও রাশিয়া টিকে আছে। একইভাবে মজলুম মুসলমানরাও টিকে আছে। এবার এই দুই পক্ষ এক হওয়ার পালা যে বন্ধুত্বের কথা বলা আছে পবিত্র কোরআনে।
প্রসঙ্গত রাশিয়ার কথা বললে কিছু মুখস্ত কথা শোনা যায়। বিশেষ করে চেচনিয়া ও সিরিয়ায় মুসলমান হত্যার প্রসঙ্গ সামনে আসে। সিরিয়ার বিষয়টি একটি গোলকধাঁধা। এখানে কে কাকে মারে, কোন বিদ্রোহী সংগঠন কার মদদে চলে এসব ঠাওর করাই কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা বরং প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে তুরস্ক, ইরান, আমেরিকাসহ সব পরাশক্তি যখন যাদের স্বার্থে আঘাত লাগে তখন তাদের শক্তির প্রদর্শন করে। বরং রাশিয়া এখানে না থাকলে শক্তি প্রদর্শনটা কেমন হতো সেটাই বিবেচ্য। তবে কৌশলগত কারণে রাশিয়ার অবস্থান ধরে নিলেও তারা দায় এড়াতে পারেনা। কিন্তু এই লেখায় বলতে চাচ্ছি যে চূড়ান্ত পর্যায়ে রাশিয়া মজলুম মুসলমানদের পক্ষে থাকবে যা নিচে রেফারেন্সসহ আলোচনা করা হয়েছে।
আর চেচনিয়া ঘটনার সময়কালটি দেখুন। প্রথম চেচেন যুদ্ধ ৯০ দশকের ঘটনা। দ্বিতীয় চেচনিয়া যুদ্ধ হয় ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। যা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পুঁতে যাওয়া বীজের ফসল ছিল। তার প্রমাণ বর্তমান পরিবর্তিত চেচনিয়া যেখানে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বড় কোন সংঘাত নাই। পরিবর্তিত এই রাশিয়ার শাসনভার পাকাপোক্ত হয় ২০১২ সালের পর যখন প্রধানমন্ত্রী থেকে পুনরায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ভ্লাদিমির পুতিন। এটা নতুন রাশিয়া। এটা অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদের রাশিয়া যাদের সাথে বন্ধুত্বের বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
কোরআনের দুটি আয়াত শেয়ার করতে চাই যার একটি হলো “তোমরা ইহুদী ও নাসারাদের বন্ধু হিসাবে গ্রহন করো না” সুরা আল-মায়েদার ৫১।
এখানে নাসারা বলতে খ্রিষ্টানদের বলা হয় এবং ঢালাওভাবে সব খ্রিষ্টানদের এক কাতারে উল্লেখ করা হয় যা সঠিক না। এটি আসলে শয়তান পূজারী ইহুদি, খ্রিষ্টান বা যে কেউ হোক না কেন তাকেই বুঝায়। আর এদের সাথে বন্ধুত্ব করা নিষেধ।
উপরের আয়াতটি প্রায়শ শোনা গেলেও আরো একটি আয়াত কম শোনা যায়। সেটি হলো “আপনি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রিষ্টান বলে। এর কারণ এই যে, তাদের মধ্যে আলেম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহঙ্কার করে না”– সূরা মায়েদাঃ ৮২। এরা কোন্ খ্রিষ্টান যাদের মধ্যে আলেম, দরবেশ আছে আবার অহংকার করেনা? এরা ইউরোপ আমেরিকার ক্যাথলিক বা প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান না। এরা অর্থোডক্স খ্রিষ্টান যারা ভাটিক্যান সিটি থেকে বিভক্ত হয়ে এখন রাশিয়ার মস্কো কেন্দ্রিক। এটা ঠিক রাশিয়া বলে কথা না। খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা আলেম, দরবেশ এবং অহংকার করেনা তারা যদি ল্যাটিন আমেরিকায়ও থাকেন তবে তাদের সাথে বন্ধুত্ব হবে। মালহামার প্রস্তুতি নিতে হলে আল্লাহর নির্দেশিত এই বন্ধুত্বকে মেনে একত্রে চলতে হবে। এটাই নির্দেশনা। কাজেই রাশিয়ান খ্রিষ্টানদের সাথে চুক্তি হয়ে ইহুদিদের পরাজিত করবে আবার এই অর্থোডক্স খ্রিষ্টান বা রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এমন ধারনা ভুল। এটা মনে করলে কোরআনের উক্ত আয়াতকে অস্বীকার করা হবে। চুক্তিটি পশ্চিমাদের সাথে এবং তারা সেটা ভঙ্গ করে মুসলমানদের সাথে চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। এটিই হবে প্রকৃতপক্ষে মালহামার চূড়ান্ত পর্ব। এতে রাশিয়া এবং অন্যান্য অর্থোডক্স মিত্ররা মজলুম মুসলমানদের পাশে থাকবে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সম্প্রতি রাশিয়ার বদলে যাওয়ার গতিবিধিও তেমনটাই ইঙ্গিত করে।
মুসলমানদের পিছন দিককার শত্রু কারা?
উক্ত হাদিসের পিছন দিককার শত্রু বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এরা যদি তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্য হয় তবে ব্যাখ্যা একরকম হবে আবার যদি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে ধরা হয় তবে ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ উল্টে যাবে। এখানে বাইজেন্টাইন বা বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতা অথবা বিচ্ছিন্ন হওয়া অর্থোডক্স খ্রিষ্টান সম্প্রদায় বা রাশিয়া উভয়ের কাউকে পিছন দিককার শত্রু হিসেবে ধরলে হাদিসটির ব্যাখ্যা মিলবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি সহজে প্রমাণিত। যেমন সৌদি আরবসহ আরবদেশগুলো পশ্চিমাদের সাথে চুক্তি ও স্বার্থের বেড়াজালে যেভাবে আটকে আছে, বড় কোন সংঘাত ছাড়া তা থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি রাশিয়ার সাথে ওপেক স্বার্থে ও বাহ্যিক কিছু বিষয়ে দহরমমহরম লক্ষ্য করা গেলেও সেই বেড়াজাল ছিড়ে আরবদেশগুলো রাশিয়ার সাথে বড় কোন সন্ধি চুক্তি করবে এটা অবাস্তব। ইরানের সাথে রাশিয়ার একাধিক চুক্তি হচ্ছে। হাদিসে বলা হচ্ছে “তোমাদের সাথে চুক্তি হবে”। এই তোমাদের বলতে আরবদেশ বুঝায়। কিন্তু ইরান তো আরবদেশ না। তাহলে কেনো এটা নিয়ে বিতর্ক? বরং আরবদেশগুলোর সাথে হাদিস ও বাইবেলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পশ্চিমাদের সাথে হুবুহু ফরম্যাটের সন্ধি চুক্তি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে এবং সবচেয়ে বড় চুক্তিটি সৌদি আরবের সাথে যা সম্ভবত এখনও আলোচনার টেবিলে। আর এটি হওয়ার মধ্য দিয়ে হাদিস ও বাইবেলের ভবিষ্যৎবাণী সম্পূর্ণরূপে সত্য প্রমাণিত হবে। পরবর্তী একটি লেখায় আব্রাহাম চুক্তি সংক্রান্ত আরো বিস্তারিত থাকবে ইন শা আল্লাহ।
তাহলে পিছন দিককার শত্রু তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্য ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট থাকলো না। সে সময়ের পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু পারভেজ) যিনি মহানবী সা. এর ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত চিঠি ছিড়ে ফেলেছিলেন, যেই ধৃষ্টতা রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসও দেখাননি। এই পারস্য সাম্রাজ্য বা বর্তমান ইরানই হলো হাদিসে উল্লেখিত পিছন দিককার শত্রু। আরবদেশ ও পশ্চিমাদের মধ্যে সন্ধি চুক্তির পর একত্রে ইরানকে পরাজিত করা হবে, সিরিয়ায় যার উদাহরণ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যাচাই করলেও এর সম্ভাবনা খুজে পাওয়া যায়। রাশিয়ার সাথে শীতল যুদ্ধের সময় থেকে ইরানকে নিজেদের পক্ষে রেখেছিল পশ্চিমা শক্তি। মধ্যপ্রাচ্যে তারাই সুন্নি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইরানকে ব্যবহার করে। প্রক্সি বাহিনীকে ফলস এনিমি হিসেবে দার করিয়ে পশ্চিমা শক্তির সাথে যুদ্ধে জড়ানো হয়। ফলাফল নিরিহ মুসলমান হত্যা। কিন্তু এসব প্রয়োজন এখন শেষ। এখন সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ আরব দেশের সাথে চুক্তি হচ্ছে। অপরদিকে ইরান এবং তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলো কোণঠাসা হচ্ছে। কাজেই হাদিস এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট একই বাস্তবতার দিকে দাড়িয়ে গেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে এভাবে আশ্চর্যজনকভাবে হুবুহু মিলে যাওয়ার পরও এটি কারো আলোচনা/বিশ্লেষণে আসেনি কেন সেটিই বরং বিষ্ময়। এটি নিয়ে চূড়ান্ত সিন্ধান্তে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূণ। প্রচলিত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণই শুধু না, ভিন্ন রেফারেন্সসহ যথাসাধ্য ভেবেচিন্তে আমার মতামত শেয়ার করলাম। আরো সুস্পষ্ট সমাধান পবিত্র কোরআনে আছে যা নিচের ধারাবাহিক আলোচনায় থাকবে।
শত্রু রাষ্ট্র নেই, রাষ্ট্রের ভিতর শত্রু আছে
আমাদের কোন শত্রু রাষ্ট্র নেই, রাষ্ট্রের ভিতর শত্রু আছে। দেশকে শত্রু ভাবা মানে পুরো জাতিকে শত্রু ভাবা যা খুবই বিপদজনক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। ভারতে প্রায় ২০ কোটি মুসলমান, এছাড়া অন্য ধর্মের মানুষরাও মজলুমদের পক্ষে ছিল এবং থাকবে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে দিয়ে সমগ্র দেশের জনগণকে মূল্যায়ন করা যাবে না। ইরানে শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মোটাদাগে তিনটি পক্ষ আছে যার মধ্যে একপক্ষ্য মজলুমদের কাতারে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা আছে। ইসরায়েলের হারেদি ইহুদিরা জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক বিধর্মী তরুণরা মজলুমদের পক্ষে কাজ করছে। অন্যদিকে মুসলিম দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মুশরিকদের পক্ষে কাজ করে সেটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? কাজেই প্রতিটি রাষ্ট্রের ভিতর থাকা শত্রুরা ইতিমধ্যে চিহ্নিত। পুরো রাষ্ট্র শত্রু নয়।
শত্রু-মিত্র ভারত
স্রোতের বিপরীতে বলতে দ্বিধা নেই। যত দ্রুত সঠিক সিন্ধান্তে আসা যাবে ততো মঙ্গল। এই অঞ্চলে ভারতের সাথে মুসলমানদের নিরাপত্তা স্বার্থ গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিন মুসলিম দেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থ জড়িত। আর শত্রুপক্ষ ভারতকে বেছে নিয়েছে শুধু মুসলমানদের না বরং পুরো ভারত উপমহাদেশকে ধ্বংস করার জন্য। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হবে। এক নজরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বৈরি সম্পর্কের কারণগুলো জেনে নেয়া যাক।
▪ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি আছে।
▪ তিস্তা নদীর পানিবণ্টন, ফারাক্কা ব্যারাজসহ নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ আছে।
▪ রপ্তানির তুলনায় আমদানি অনেক বেশি অর্থাৎ বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা আছে। এছাড়া শুল্ক, অশুল্ক বাধা ও বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়েও অভিযোগ আছে।
▪ অভ্যন্তরিন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ আছে।
▪ আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ আছে। চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও ভারত উদ্বিগ্ন থাকে।
সম্পর্কটি বৈরিতার চেয়ে বেশি স্বার্থনির্ভর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে রাষ্ট্রগুলো সাধারণত শত্রু বা বন্ধু হয় না, বরং স্বার্থনির্ভর হয়। এ কারণে আফগানিস্তানের মতো দেশও ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রেখে চুক্তি করে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেও মূলত স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে, কিন্তু যুদ্ধ করার মতো শত্রুতা নেই। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশের সম্পর্ক সহযোগীতা ও বৈরিতা পাশাপাশি ছিল যা আলোচনা ও পারস্পরিক ছাড়ের মাধ্যমেই টানাপোড়েন কমানো এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো ভারত আমাদের শত্রু নাকি সুনির্দিষ্ট কোন গোষ্ঠী আমাদের শত্রু? যে গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশেও আছে। আমেরিকা শত্রু নাকি সেখানকার নির্দিষ্ট গোষ্ঠী? ব্রিটিশ নাকি সেখানকার একটি গোষ্ঠী? সবখানে একই উত্তর আসবে, নির্দিষ্ট একটি শাসক শ্রেণী বা এলিট সোসাইটি যাদের কোন দেশ নেই, যারা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যারা যুদ্ধ বাধাতে চায় তারা শুধু মুসলমান না, সমস্ত মানবজাতীর শত্রু। সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায় বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ ভারত আর পাকিস্তান করছে না, বরং দুই দেশের সরকার করছে। এই যুদ্ধ আসলে দুই দেশের এলিট শাসক গোষ্ঠীর সাজানো নাটক, যারা কিনা ভয় আর ঘৃণা ছড়িয়ে লাভবান হয়। জাতীয়তাবাদ ও কাশ্মীর ইস্যুকে জিইয়ে রেখে ভারত ও পাকিস্তানের এলিটরা দারিদ্র, অসমতা, আর সরকারের বার্থতা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখে।’ রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, ‘We don’t have unfriendly nations, we have unfriendly elites in those nations.’ আসলে পুরো জাতিকে টার্গেট করে একটি শ্রেণী যে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে তা উদ্দেশ্যমূলক। সেই ঘৃণ্য উদ্দেশ্য হলো ডিপপুলেশন এবং এনডব্লিউও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। তারা একটি মহাযুদ্ধ চায় যেটি বাস্তবায়নের ধাপ হলো গৃহযুদ্ধ থেকে আঞ্চলিক যুদ্ধ তারপর মহাযুদ্ধ। আমরা কত সহজে সেই চক্রান্তের জালে আটকা পরে গেছি তা কারো কল্পনাতেও নাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যেভাবে জার্মানি এবং ব্রিটেনকে একে অপরের বর্বর শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যাতে যুদ্ধকে অনিবার্য হিসেবে গণ্য করা যায়, জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা যায় এবং জনগণের কাছে তা ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। ঠিক একইভাবে ভারতকে বাংলাদেশের বর্বর শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যার উদ্দেশ্য যুদ্ধকে যৌক্তিক প্রমাণ করা, জনগণকে প্রস্তুত করা, ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং মূল শত্রুর কাছে পৌছানোর আগেই যেনো ধ্বংস হয়ে যাই তার ব্যবস্থা করা।
এখানে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন হলো মূল শত্রুর কাছে একবারেতো পৌছানো সম্ভব না। তাই ধাপে ধাপে মোকাবিলা করা ঠিক আছে। কিন্তু তার জন্যও কি আমরা প্রস্তুত? শত্রু চিহ্নিত করে এগিয়ে যাচ্ছি নাকি শত্রুরই আরেক পক্ষের প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হটকারিতাই ব্যস্ত আছি? এই প্রচারণা কারা করছে? যারা করছে তারা মুখে ভারত বিরোধীতা করলেও ছদ্মবেশ ধারণ করে আছে একটা ভয়ংকর অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য। সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন? পরিষ্কারভাবে জেনে রাখুন তাদের উদ্দেশ্য নিরিহ মুসলমান হত্যা-নির্যাতন, ডিপপুলেশন এবং মানচিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে এককভাবে কোন দেশ ও জাতি নয়, পুরো ভারত উপমহাদেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আর এ সব কিছু করা হচ্ছে ইসরায়েলকে বিশ্ব শাসকের শাসনে বসানোর জন্য। জনসংখ্যা কমিয়ে নতুন মানচিত্র তৈরি করার জন্য। নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকায় যে নকশা করা হয়েছে সে অনুযায়ী এই অঞ্চলও এগিয়ে যাচ্ছে।
ফেসবুকের বুলি দিয়ে কামানের গুলি প্রতিহত করা যাবে না। ইসলাম এমন কোন বাস্তবতা বিবর্জিত জীবনব্যবস্থা নয়। ভাবছেন চীন ও পাকিস্তান সাহায্য করবে? ভূরাজনীতিতে স্বার্থের ঊর্দ্ধে কিছু নেই। ধরুন পাকিস্তান আর্মি হস্তক্ষেপ করলো। ভারত সেভেন সিস্টার্স, সীমান্ত ইস্যু বা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার নামে আক্রমণ চালালো। ভারতের টার্গেট হলো আওয়ামী বিরোধী শক্তি ও মতাদর্শের মানুষ। ওদিক থেকে পাকিস্তান সাহায্যের নামে মাঠে নেমে গেলো। তাদের টার্গেট হলো আওয়ামী পন্থি শক্তি ও মতাদর্শের মানুষ। বাংলাদেশে এর বাহিরে আর কোন মানুষ নাই। বিষয়টি কি দাড়ালো? প্রকৃতপক্ষে আমরা সবাই ডিপপুলেশন টার্গেটে পরিণত হলাম। উভয় দেশ একই ইশারায় নিয়ন্ত্রিত। একই শক্তি দ্বারা পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। ডিপপুলেশন মিশন সাকসেসফুল।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মঙ্গলীয়রা ইরাক আক্রমণের সময় ঘরবাড়ি, মসজিদ, প্রাসাদ, লাইব্রেরি, পয়নিস্কাশন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে গাছপালা পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অতিতে বহু সভ্যতা এরকম বর্বর আক্রমণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু মুসলমানদের যুদ্ধ ছিল সুনির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে যুদ্ধ নীতি অনুসরন করে। নবী মুহাম্মদ সা. এর সময়ের যুদ্ধের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
▪ যুদ্ধ ছিল বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে নেওয়া শেষ বিকল্প সিদ্ধান্ত।
▪ যুদ্ধের আগে শত্রুর আগ্রাসন, চুক্তিভঙ্গ, নিরাপত্তা হুমকি এসব যাচাই করা হতো।
▪ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করা হতো। বদর, উহুদ প্রভৃতি যুদ্ধে কৌশল নির্ধারণে শূরার ভূমিকা ছিল।
▪ তুলনামূলক স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়েছিল।
▪ শত্রু সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হতো। শত্রুর সংখ্যা, অবস্থান, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো। অন্ধভাবে যুদ্ধ করা হয়নি।
▪ আত্মিক ও নৈতিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল), দোয়া ও ইবাদত করা হতো।
▪ একবার চুক্তি হলে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হতো। শত্রু হলেও চুক্তি ভঙ্গ করা হয়নি। হুদায়বিয়ার সন্ধি এর বড় উদাহরণ।
▪ নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও বেসামরিক লোকদের হত্যা নিষিদ্ধ ছিল।
▪ গাছপালা ও ফসল ধ্বংস নিরুৎসাহিত করা হতো। কৃষক ও শ্রমজীবীদের আক্রমণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
▪ উপাসনালয়, ধর্মযাজক ও সন্ন্যাসীদের ক্ষতি না করার নির্দেশ ছিল।
▪ শহর অবরোধ করা হতো। দুর্গ, প্রাচীর ও সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হতো। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাকেন্দ্র রক্ষার চেষ্টা করা হতো।
▪ যুদ্ধবন্দীদের হত্যা না করে মুক্তিপণ, বিনিময় বা মুক্তির ব্যবস্থা করা হতো।
▪ বিজয়ের পর প্রতিশোধ নেওয়া হয়নি। যেমন মক্কাবিজয়ের পর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল।
▪ যুদ্ধকে কখনো আনন্দ বা গৌরবের বিষয় বানানো হয়নি। আল্লাহর ওপর ভরসা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য ছিল।
নবী মুহাম্মদ সা. এর সময়কাল এবং ইসলামী যুগের যুদ্ধ সংক্রান্ত ইতিহাস থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় সেগুলোই আদর্শ হওয়া উচিত। ইসলাম ধর্ম কখনও সাধারণ ইহুদি নাগরিক হত্যার অনুমতি দেয়নি। সাধারণ হিন্দু নাগরিকদের হত্যা-নির্যাতনের অনুমতি দেয়নি। গাজওয়াতুল হিন্দ মানে কখনও হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। বরং এটিও সেই সুনির্দিষ্ট এলিট শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই যারা কেবল ভারতে না পকিস্তান, বাংলাদেশ সবখানে আছে। এরা গ্লোবাল এলিটসদের প্রতিনিধি হয়ে সব অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।
বিপ্লব মানে কোন হটকারিতা নয়। মজলুমদের শত্রু কোন দেশ নয়, সুনির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী। বিপ্লব হবে খাদ্য নিয়ে। কারণ জিএম ক্রপস, কীটনাশক, জিও ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদির মাধ্যমে খাবার ধ্বংস করা হয়েছে। সেখান থেকে কিভাবে শরীর টিকিয়ে রাখা যায় সেই লড়াই করতে হবে। বিপ্লব হবে অর্থ ব্যবস্থা নিয়ে। কারণ ডিজিটাল আইডি ও সিবিডিসির মাধ্যমে মানুষের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ (TOTAL CONTROL) আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিপ্লব হবে ধর্ম নিয়ে। কারণ ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুসলমানসহ সব ধর্ম একত্রিত করে নতুন ধর্ম চালু করা হচ্ছে। কিন্তু কিসের বিপ্লব! কজন জানি এই শয়তানি নতুন ধর্ম সম্পর্কে? জলবায়ু পরিবর্তনের নামে যে কৃত্তিম পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে তা প্রচলিত বিপ্লব দিয়ে কি আটকানো যাবে? এই সমস্ত কিছুর মাস্টারমাইন্ড হলো একটি গোষ্ঠী। নির্দিষ্ট কোন দেশ নয়। ভারত কেনো, আমেরিকা ধ্বংস হয়ে গেলেও এরা টিকে থাকবে।
বাস্তবতা হলো যে ট্রেন চালু হয়ে গেছে তা আর থামবে না। একদল পেইড এজেন্ট। একদল বিভ্রান্ত। একদল হুজুগে। কেউ যেদিকে ঢেউ সেদিকে পাল তুলে। কেউ সত্যিকার আবেগ নিয়ে কিন্তু ভুল পথে। এরই মধ্য থেকে অতি অল্প সংখ্যক যারা আসহাবে কাহাফের যুবকদের মতো। যারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। যারা শত্রু চিনবে, বিভ্রান্ত হবে না। তারা বিজয়ী হবে।
শত্রুপক্ষের শক্তি বিবেচনায় বন্ধুত্ব
আশিটি পতাকা তলে সমবেত হয়ে কারা চূড়ান্তভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে তা উপরের আলোচনায় আশা করি নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিশাল এই বাহিনীর শক্তি সামর্থও অকল্পনীয়। এই শক্তিকে মোটাদাগে নিচের দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
- বিশাল সামরিক শক্তি এবং
- স্পিরিচুয়াল শক্তি
আমেরিকা ও মিত্র বাহিনীর যে বিশাল সামরিক শক্তি তা এক কথায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ন্যাটোর একক শক্তিবলেই তারা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের মাতব্বর যে ন্যাটোর সিংহভাগ ফান্ডিং এককভাবে আমেরিকা বহন করে। এই সামরিক শক্তির ব্যাপারে মোটামুটি সবাই জানলেও স্পিরিচুয়াল শক্তিকে মানুষ আমলে নেই না। কারণ এটি কামান, গোলাবারুদের মতো দৃশ্যমান নয়। অদৃশ্য শক্তি। তারা যে ডার্ক স্পিরিচুয়াল প্রাকটিস করে যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি। উদাহরণস্বরূপ আল-আকসা ও ডম অফ দ্য রকের ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি না বরং স্পিরিচুয়াল শক্তির ব্যবহার হয়। ইয়াহুদীদের লাল গাভী সাক্রিফাইস করাকে কোন সামরিক শক্তি দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। এটি নিঃসন্দেহে স্পিরিচুয়াল প্রাকটিস। এবং সামরিক শক্তি দিয়ে তা মোকাবিলাও করার বিষয় নয়। এই ডার্ক স্পিরিচুয়াল প্রাকটিসের চূড়ান্ত নির্মাণ হলো থার্ড টেম্পল যেখানে তাদের রাজা দাজ্জালকে বসানোর জন্য এতো আয়োজন। কাজেই এই দুটি শক্তিকেই আমলে নিতে হবে। এস্কেটোলজি দৃষ্টিকোণ থেকে এই শক্তি মোকাবিলার ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ সমীকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যায় আর তা হলো –
▪ বিশাল সেই সামরিক শক্তির মোকাবিলা হবে রাশিয়ানদের সাথে। রাশিয়া তাদের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
▪ স্পিরিচুয়াল শক্তির মোকাবিলা হবে মুসলমানদের সাথে। মুসলমানরা তাদের স্পিরিচুয়াল প্রতিদ্বন্দ্বী।
এর কোনটিই সহজ পথ নয়। রাশিয়াকে হয়ত কড়া মূল্য দিতে হবে তেমনি মুসলমানরা তাদের হারানো স্পিরিচুয়াল শক্তিকে ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।
মাওয়ালি বা নওমুসলিমদের দল কারা?
মাওয়ালি বা মাওয়ালা হলো ধ্রুপদি আরবির একটি পরিভাষা যা দ্বারা অনারব মুসলিমদের বুঝানো হতো। মাওয়ালি অর্থাৎ নওমুসলিমদের একটি দল শ্যামদেশে মজলুমদের বন্ধু হয়ে যোগ দিবে যখন তাদের উপর অত্যাচার জুলুম চরম আকার ধারন করবে। আবু হুরায়রা রা. এর বর্ণনায় সুনানে ইবনে মাজাহায় পাওয়া যায়, একটা সময় আসবে যখন বিশ্ব জুড়ে বড় বড় যুদ্ধ দেখা দিবে তখন আধুনিক অস্ত্রে স্বজ্জিত মাওয়ালিদের অর্থাৎ নওমুসলিমদের একটি দল সত্যের পক্ষে লড়াই করতে থাকবে। আল্লাহর এই বিশেষ সাহায্য যাবে শ্যামদেশে।
খুজে দেখার চেষ্টা করি যে, এই মাওয়ালি বা নওমুসলিমরা কারা? এখানে দুটি বড় শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে। একটি হলো এরা অনারব হবে অর্থাৎ আরবদেশের বাহিরে অন্য কোন দেশ। দ্বিতীয়টি হলো এরা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকবে। অনারবদের মধ্যে দুটি অঞ্চল বা দল আছে যারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। ১. রমজান কাদিরভের চেচেন বাহিনী। ২. ইরান বা ইরানের আইআরজিসি। শিয়া মতবাদের কারণে ইরানের বর্তমান ভূমিকা প্রশ্নবৃদ্ধ হলেও সময়ের পরিক্রমায় পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তাদের ৩টি দলের একটি তুলনামূলক হক পথে আছে। পার্থক্য কেবল তারা খলিফাদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) কে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তবে সবকিছু বিবেচনায় চেচেন বাহিনীকে অগ্রগণ্য হিসেবে ধরা যায়। তারা রাশিয়ার আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এবং অনারব। তাছাড়া সাম্প্রতিক নানা আলামত থেকেও এটি ধরে নেয়া যেতে পারে। অথবা এটি একক কেউ না হয়ে সম্মিলিত বাহিনীও হতে পারে।
বন্ধুদেশ আফগানিস্তান
খোরাসান হলো মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল। মধ্যযুগে বর্তমান ইরানের উত্তরপূর্ব অঞ্চল, আফগানিস্তান, দক্ষিণ তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই খোরাসানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যসব দেশের কিছু অংশ করে হলেও বর্তমান আফগানিস্তানের সমগ্র অঞ্চলই খোরাসানের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আফগানিস্তানের সম্প্রতি নাটকীয় উন্থান যেন অলৌকিকতাকেও হার মানায়। তাছাড়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সবশেষ আমেরিকাকে পরাস্ত করে তাদের এই ধারাবাহিক উন্থান কিছু একটা ইঙ্গিত বহন করে। এ যেনো রাসূলুল্লাহ (সা.) কথাকেই মনে করিয়ে দেয় – “যখন তুমি খোরাসানের দিক থেকে কালো পতাকাবাহী সৈন্য আসতে দেখবে, তখন তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাবে। কেননা তার মাঝে আল্লাহর খলীফাহ্ মাহদী থাকবেন।”






GIPHY App Key not set. Please check settings