in

ব্যর্থ বিপ্লব: ফরাসি বিপ্লব থেকে জুলাই বিপ্লব

ব্যর্থ ফরাসি বিপ্লব থেকে জুলাই বিপ্লব

ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধ বা বিপ্লব শুরু হয়েছিল শান্তি ও সমৃদ্ধ সমাজ ও বিশ্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফরাসি বিপ্লব থেকে আমাদের জুলাই বিপ্লব; সব ব্যর্থ। বিপ্লবের চূড়ান্ত ফসল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়নি। বরং একই পরিণতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সর্বোপরি বিপ্লব ব্যর্থ।

এর কারণ খুজতে গেলে মাথা খারাপ হওয়ার যোগার হতে পারে। কারণ অসংখ্য লেখা ও বিশ্লেষণ আছে যার বেশিরভাগই প্রকৃত কারণকে পাশ কাটিয়ে গৌণ বিষয় নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বিপ্লব বা বড় বড় যুদ্ধের অসংখ্য ডাইমেনশন থাকে। একেক পক্ষ একেক ধরনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পিছনে ছুটে। তাই একেক বিশ্লেষক একেক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোাচনা করবেন এটাও অস্বাভাবিক না। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে এখানে এমন এক পক্ষের উল্লেখ করা হবে, যারা ব্যর্থ হয়নি। জয় পরাজয় যেদিকেই যাক, পর্দার আড়ালের বিজয়ী তারাই। ফরাসি বিপ্লব থেকে জুলাই বিপ্লবের বিজয়ী পক্ষ এক।

সুনির্দিষ্ট কারণে এখানে ফরাসি বিপ্লব থেকে জুলাই বিপ্লবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি এই লেখার একটি বিশেষত্ব – সম্ভবত অতীতে কখনও ফরাসি বিপ্লবকে এভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। একই সাথে পক্ষ বিপক্ষ উভয়কে নিয়ন্ত্রণ করে যে সুপরিকল্পিত সাজানো বিপ্লবের সূচনা, তার যাত্রা শুরু হয় ফরাসি বিপ্লব থেকে। সেই একই ধারাবাহিকতা আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থ্যা, সামরিক জোট, কর্পোরেট, মিডিয়া, এনজিও এবং সম্প্রতি এআই এর মাধ্যমে যুদ্ধ ও বিপ্লব একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। শেষ মূহুর্তে একদল শাসক শ্রেণী ও ‘বিপ্লবী জনগণ’ সামনে থাকলেও প্রতিটি বিপ্লবকে চূড়ান্ত রূপ দিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে পর্দার আড়ালের কুশিলবরা। ফরাসি বিপ্লব থেকে জুলাই বিপ্লবের কৌশল এক, প্রায় একই ধরনের স্লোগান, পর্দার আড়ালের কুশিলব এক, পরিণতিও এক। শেষ পরিণতি হলো বিপ্লব ব্যর্থ। বিপ্লবের ফসল চলে গেছে আড়ালের ঐসব কুশিলবদের ঘরে। প্রশ্ন হলো, প্রতিটি বিপ্লবের এই একই পরিণতি কি কাকতালীয়? কেন ফরাসি বিপ্লব, কেন এই পরিণতি, কিভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বিপ্লবের এই ধারাবাহিকতা শেষ হতে পারে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করা হবে এই লেখায়।

বিপ্লব ও গৎবাঁধা প্যাচাল

ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকরা যে গৎবাঁধা প্যাচালগুলোকে মুখ্য হিসেবে তুলে ধরে আসছে এখানে তা মুখ্য নয়। তবে আলোচনার খাতিরে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করব। বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পিছনে প্রচলিত বয়ান ও তথ্যপ্রবাহ আমাদেরকে যে শিক্ষা দেই সেগুলো হলো:

➥ বিপ্লব হাইজ্যাক হয়ে গেছে: ফরাসি বিপ্লবের কথাই যদি ধরা হয়, এর মূল স্লোগান ছিল ‘সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা’। কিন্তু বিপ্লবটি দ্রুতই ‘রেইন অফ টেরর’ বা সন্ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্রে গিয়ে ঠেকে। এভাবে প্রতিটি বিপ্লব ব্যর্থ হয়, আর এক শ্রেণী যেনো রেডি স্ক্রিপ্ট নিয়ে হাজির হয়ে বলে ‘বিপ্লব হাইজ্যাক হয়ে গেছে’!

➥ পরিকল্পনার অভাব: অনেক সময় বিপ্লব শুরু হয় কেবল বিদ্যমান শাসনের প্রতি ক্ষোভ থেকে। কিন্তু পুরনো ব্যবস্থা পতনের পর নতুন রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকলে বিপ্লব দিক হারিয়ে ফেলে। বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে আবার পুরনো ব্যবস্থার দিকেই ঝুঁকে পড়ে।

➥ নেতৃত্বের কোন্দল ও ক্ষমতার লড়াই: বিপ্লবের শুরুতে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ একজোট হলেও, লক্ষ্য অর্জনের পরপরই তাদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়। নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে যখন উপদলগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, বিপ্লবের মূল শক্তি হারিয়ে যায়।

➥ প্রতিবিপ্লব: পুরনো ব্যবস্থার সাথে যুক্ত প্রভাবশালী গোষ্ঠী, সামরিক বাহিনী বা আমলাতন্ত্র সহজে তাদের ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। তারা পর্দার আড়াল থেকে ষড়যন্ত্র করে বা সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থান করে প্রতিবিপ্লবের (Counter-Revolution) মাধ্যমে বিপ্লবের ফলাফলকে নস্যাৎ করে দেয়।

➥ বিদেশি হস্তক্ষেপ: অনেক সময় ভূ-রাজনৈতিক কারণে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো কোনো দেশের বিপ্লবকে সমর্থন করে না। তারা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ বা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিপ্লবকে ব্যর্থ করে দেয়।

➥ প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান: বিপ্লবের পর মানুষ দ্রুত পরিবর্তনের আশা করে। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি বা প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে যদি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত না হয়, তবে জনসমর্থন দ্রুত কমতে থাকে।

➥ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারা: বিপ্লব মানেই কেবল রাজপথের আন্দোলন নয়। আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা কাঠামোর রূপ দিতে হয়। যদি নতুন কোনো শক্তিশালী প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো তৈরি করা না যায়, তবে পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাই আবার ফিরে আসে।

➥ আবেগ ও বাস্তবতার ভিন্নতা: ‘বিপ্লব করা সহজ, কিন্তু বিপ্লব রক্ষা করা কঠিন।’ — এই ঐতিহাসিক সত্যটিই বারবার প্রমাণিত হয়েছে ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের আরব বসন্ত পর্যন্ত বিভিন্ন গণঅভ্যুত্থানে। বিপ্লবের মাধ্যমে পুরনো কাঠামো ভেঙে ফেলা সহজ, কিন্তু নতুন এবং ন্যায়সঙ্গত কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। অধিকাংশ বিপ্লবের পর দেখা গেছে, বিপ্লবীরা আন্দোলন করতে দক্ষ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় বা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ততটা সফল হননি।

➥ ভুল বয়ান ও প্রোপাগান্ডা: অনেক সময় বিপ্লব মানে কেবল এক শাসক গোষ্ঠীর হাত থেকে অন্য গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা যাওয়াকে বুঝায়, সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন নয়। সাধারণ মানুষ যে মুক্তির আশায় লড়াই করে, বিপ্লব পরবর্তী শাসকরা অনেক সময় সেই আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে।

➥ যুদ্ধের অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি: বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রায়ই গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা বৈদেশিক আক্রমণ শুরু হয়। অব্যবস্থাপনা ও অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী বা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে নেয় অথবা দুর্বল কাউকে ক্ষমতায় বসানো হয় যাতে সুবিধা আদায় করা সহজ হয়। ফলে বিপ্লবের যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার হওয়ার কথা ছিল, তা অধরায় থেকে যায়।

বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে একদল রেডি স্ক্রিপ্ট নিয়ে হাজির হয়ে উপরের বয়ানগুলো পেশ করে থাকেন। একটি মহল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এসব পুরনো রেকর্ড বাজিয়ে গেছে। এগুলো যেমন বাস্তবতা, তেমনি সত্যতাও আছে। কিন্তু এর বাহিরেও এমন এক সত্য লুকিয়ে আছে যা মানুষ খুব কম স্পর্শ করে। এই অস্পৃশ্য সত্যকে টেনে বের করে আনার সময় এখন।

ইতিহাসের পাতায় বিপ্লব

বিশেষ একাধিক আলামতের উপর ভিত্তি করে এখানে ফরাসি বিপ্লবকে বর্তমান ধারার বিপ্লবের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আগের বিপ্লব, বিদ্রোহ ও শাসন ব্যবস্থার পতনের পিছনে বেশিরভাগ কারণ ছিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অভ্যন্তরিন দ্বন্দ, রাজাদের দুর্নীতি ও উদাসীনতা, বহিঃশত্রুর আক্রমণ। কিন্তু ফরাসি বিপ্লব থেকে ভিন্ন একটি কার্ডের প্রয়োগ শুরু হলো। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিদ্রোহী ও পক্ষ-বিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণের ধরন, অর্থ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া আগের যুদ্ধ-বিপ্লবে রাজা পরিবর্তন হলেও ‘রাজতন্ত্র’ বদলায়নি। ফরাসি বিপ্লবই প্রথম এই ধারণা ভেঙে দেয় এবং জনগণের তথাকথিত সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, শাসন করার ক্ষমতা রাজার নয়, বরং জনগণের। শ্লোগান শুরু হয় অধিকার, বিজয়, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, স্বাধীনতা। এই শ্লোগানগুলোই আজও প্রতিটি বিপ্লবের প্রাণভোমরা। কিন্তু সেই প্রাণভোমরা আজও অধরাই রয়ে গেছে। ফরাসি বিপ্লব থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বিপ্লবের একই কৌশল, একই কুশিলব, একই পরিণতি যার মূলে আছে অর্থ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিপ্লব ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যকার গোপন যোগসাজোস ইতিহাসের অন্য সময়ে ঠিক এভাবে ঘটার নজির খুজে পাওয়া যাবে না।

৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দাসেদের বিদ্রোহ (স্পার্টাকাস বিদ্রোহ) ছিল রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে শোষিত দাসেদের এক বিশাল সংগ্রাম। স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে হাজার হাজার দাস রোমান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। জার্মান কৃষক বিদ্রোহ (১৫২৪–১৫২৫) কে অনেকে আধুনিক যুগের আগে ইউরোপের সবচেয়ে বড় বিপ্লব হিসেবে দেখেন। মার্টিন লুথারের ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে জার্মানির কৃষকরা দাসত্ব প্রথা ও উচ্চ করের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল। দাস বনাম মালিক শ্রেণির মধ্যে হাইতিয়ান বিপ্লব (১৭৯১-১৮০৪) যেটি ইতিহাসের একমাত্র সফল দাস বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেছিল। মাও সে তুং-এর নেতৃত্বে কৃষক ও সর্বহারা বনাম সামন্তপ্রভুর মধ্যে চীনা বিপ্লব (১৯৪৯) ছিল ইউরোপের বিপ্লব থেকে ভিন্ন ধারার। চীনা বিপ্লবে কৃষকদের প্রধান বিপ্লবী শক্তি হিসেবে দেখা হয়। সংগ্রামটি ছিল ভূমিহীন কৃষক ও সর্বহারা শ্রেণির সাথে সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামী এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে এরকম আরো বিপ্লব পাওয়া যাবে। কিন্তু হাইতিয়ান ও চীনা বিপ্লবের মতো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ফরাসি বিপ্লব থেকে অতিতের অন্যান্য বিপ্লবের পার্থক্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। অর্থ ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ হলো সেই পার্থক্যের মানদন্ড। বলা যায় শাসক ও বিপ্লবী উভয় পক্ষকে অর্থের বেড়াজালে বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া শুরু হয় ফরাসি বিপ্লব থেকে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ববিদদের মতে এই সূচনাটি হয় ইলুমিনাতি, ফ্রিম্যাসনদের হাত ধরে। এই ধারাবাহিকতা এখনও চলমান। এছাড়া অতীতের অধিকাংশ বিপ্লব শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তিতে হয়। আর ফরাসি বিপ্লব ও পরবর্তী ১৮৪৮ সালের ইউরোপীয় বিপ্লবগুলো ছিল আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেও একই ধারাবাহিকতা চলমান আছে। শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তিতে আর বিপ্লব হয়না। বরং শ্রেণি সংগ্রামকে পুজি করে রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে বিপ্লবকে কৃত্তিমভাবে জাগ্রত করা হয় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। এবং কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বিপ্লব পরবর্তীতে এক সামন্ত প্রভুর হাত থেকে ক্ষমতা আরেক সামন্ত প্রভুর হাতে হস্তান্তরিত হয়।

তথাকথিত সফল বিপ্লব

অপরদিকে সফল বিপ্লবের ইতিহাস খুজলেও ফরাসি বিপ্লবের নাম পাওয়া যায়। সার্বিকভাবে ঐতিহাসিকগণ এটিকে ব্যর্থ বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করলেও এক পক্ষের কাছে সফল। ঠিক জুলাই বিপ্লব যেমন ইতিমধ্যে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত হলেও এক পক্ষের কাছে সফল। কিন্তু কি সেই সফলতা? কাদের কাছে সফল? ফ্রান্সে কয়েক শতাব্দীর রাজতন্ত্রের অবসান এবং সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা—এই তিন মূলমন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল ফ্রিম্যাসন আলবার্ট পাইকদের পরিকল্পনা। ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ ছিল শত বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে তথাকথিত গণতান্ত্রিক চিন্তা ও মানবাধিকারের প্রসারের সূচনা করা। এই অর্থে ফরাসি বিপ্লব সফল। এই দৃষ্টিকোণ থেকেও এজেন্ডা ২০৩০ সফল করতে যত বিপ্লব ঘটানো হয় তার সূচনাও হলো ফরাসি বিপ্লব। এরই ধারাবাহিকতায় ইউরোপ জুড়ে আরো অনেক বিপ্লব হয় যার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পার্লামেন্টের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান ঘটিয়ে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে। এটিও নাকি সফল বিপ্লব! কিন্তু কাদের কাছে সফল? এর পরিণতি আমরা এখন জেনে গেছি। ১৯৭৯ সালে ইরানে মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে একটি ধর্মতাত্ত্বিক বা ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ মুসলমানও এটিকে সফল বিপ্লব বলে থাকেন। এ বিষয়ে বিচ্ছিন্ন মতামত বিভিন্ন লেখায় শেয়ার করেছি। তবে জানি যে, এর পরিণতি বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত সেসব মতামত গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। শুধু একটা কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, এই জায়গা থেকেই মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় ধোকা এবং ভয়াবহতম ফিতনার আত্নপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে। কাজেই এই বিপ্লব সেই ধোকাবাজের কাছে সফল। মুসলিম বিশ্বের জন্য নয়। ১৭৬০ -এর দশকে রথচাইল্ডের উন্থান এবং ১৭৮৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে যত বিপ্লব হয় তা তাদের জন্য সফল। সাধারণ মানুষের জন্য নয়।

আলবার্ট পাইকের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের নকশা

মূলধারার ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে প্রথম দুটি বিশ্বযুদ্ধ ছিল তৎকালীন ক্ষমতার লড়াই এবং সাম্রাজ্যবাদের ফল। সেই বিচারে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সফলতার চিত্রটি হলো অটোমান, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় এবং রুশ সাম্রাজ্যের পতন। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে যায় এবং অনেকগুলো নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়। বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য ‘লীগ অফ নেশনস’ গঠিত হলেও তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। এগুলো সব আলবার্ট পাইকদের সফলতা। সাধারণ বিশ্ববাসী কি পেলো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে সরিয়ে দিয়ে বিশ্বমঞ্চে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রধান শক্তি হিসেবে বাইপোলার নতুন বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙ্গে আমেরিকা একক পরাশক্তি হিসেবে ইউনিপোলার নতুন বিশ্বের যাত্রা শুরু হয়। লিগ অফ নেশনসের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতিসংঘ গঠিত হলো। আবারো প্রশ্ন, যুদ্ধ কি থেমেছে? শান্তিকামী বিশ্ববাসী কি পেলো? আসলে এগুলো সব আলবার্ট পাইকদের সফলতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সাম্প্রতিক বিপ্লব ও যুদ্ধেও তারা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে। বিশ্ববাসী আগে থেকে সোচ্চার না হলে এবারও সফল হবে। কাজে সবার আগে চক্রান্ত এবং প্রকৃত চক্রান্তকারীদের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। গতাণুগতিক বিপ্লবের সেই ধারাবাহিকতা ভেঙ্গে দিয়ে গত কয়েক শতাব্দী ধরে যে সমস্যাগুলো তৈরি করা হয় সেইসব ইস্যু ধরে ধরে বিপ্লব প্রয়োজন। তারা যে বিপ্লবের ফাঁদে ফেলাতে চায় তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ব্যতিক্রম কিছু বিপ্লব সত্যিকার অর্থে সফল হয় যেগুলো চিহ্নিত কঠিন নয়। সাধারণ মানুষের আন্দোলনকে এলিটসরা দমন করে, আবার কখনো নিজেদের স্বার্থে সেই আন্দোলনকে হাইজ্যাক করে নেয়। তাই যেকোনো বিপ্লবের সফলতা বিচার করতে হলে দেখতে হয়—বিপ্লবের পর ক্ষমতা কি সাধারণ মানুষের হাতে এসেছে, নাকি কেবল পুরনো এলিটের জায়গায় নতুন কোনো গ্লোবাল অংশীদার বসেছে।

ফরাসি বিপ্লব: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সময়কাল

রথচাইল্ড রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মেয়ার আমশেল রথচাইল্ড তখন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে নিজের ব্যবসা গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। ১৭৬০ এর দশকে রথচাইল্ড পরিবারের উত্থান হলো। ১৭৭৬ সালের ১ মে ইলুমিনাতির জন্ম। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকার জন্ম হলো। এরপর ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব। পরপর ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি কোন যোগসূত্র আছে?

যদিও বলা হয়ে থাকে রথচাইল্ড পরিবারের আসল উত্থান ঘটে ফরাসি বিপ্লবের অনেক পরে, বিশেষ করে নেপোলিয়নিক যুদ্ধের (১৮০৩–১৮১৫) সময়। ১৭৮৯ সালে রথচাইল্ড পরিবার আজকের মতো এতোটা প্রভাবশালী বা সম্পদশালী ছিল না। তবে ফ্রাঙ্কফুর্টের একজন রাজপুত্রের (উইলিয়াম নবম) অর্থ ব্যবস্থাপক হিসেবে অর্থের উপর নিয়ন্ত্রণ পায়।

যোগসূত্র নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক আলোচনা এবং বিতর্কিত তত্ত্ব প্রচলিত আছে। বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের ইতিহাসের সত্যতা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং স্পিরিচুয়ালিটির গভীরে ঢুকে সত্যকে ‍খুজতে হবে।

ফরাসি বিপ্লবে যে স্বাধীনতা, সমতার বয়ান শুরু হয়, জুলাই বিপ্লব ও বিপ্লব পরবর্তীতেও সেই একই বয়ান ছিল। একের পর এক ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজতন্ত্র পতনের সময়ও একই ধরনের স্লোগান ছিল। স্বাধীনতা, সাম্য, সমতা ইত্যাদি। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ইউরোপে পরবর্তী যুদ্ধ ও বিপ্লবে পক্ষ-বিপক্ষসহ বিপ্লবীদের নিয়ন্ত্রণে একই কৌশল অবলম্বন করা হয়। অর্থাৎ আর্থিক খ্যাতের নিয়ন্ত্রণ। সেই ধারাবাহিকতা আজও চলমান আছে। সম্প্রতি সেই নিয়ন্ত্রণের কলেবর বেড়ে আর্থিক খাতের বাহিরেও আন্তর্জাতিক সংস্থ্যা, এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানি ও মিডিয়াকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব খাতেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া বিপ্লবের চূড়ান্ত মূহুর্তেও ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ করে যার নজির ফরাসি বিপ্লবে যেমন ছিল, তেমনি জুলাই বিপ্লবেও এখন এটি প্রমাণিত সত্য। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে সেই একই পক্ষ শুধুই যে বিনিয়োগকৃত অর্থের হিস্যা বুঝে নেই তা না, বরং তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়ন সেই বিনিয়োগের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

রথচাইল্ডের উত্থান, আমেরিকার জন্ম এবং ফরাসি বিপ্লব

রথচাইল্ডদের নিয়ে ফরাসি বিপ্লব কেন্দ্রিক অনেক রহস্য প্রচলিত আছে। যেমন, অনেকে দাবি করেন রথচাইল্ডরা ইলুমিনাতি, ফিম্যাসন বা গোপন সংগঠনের মাধ্যমে রাজতন্ত্র পতনের পরিকল্পনা করেছিল। অর্থাৎ এদেরই সমন্বিত পরিকল্পনায় বিপ্লব সংগঠিত হয়। তবে মূলধারার ইতিহাসবিদদের মতে রথচাইল্ড পরিবার ফরাসি বিপ্লবে অর্থায়ন করেছিল এই দাবির পক্ষে প্রমাণ পাননি এবং মনে করেন, রথচাইল্ড বিপ্লবের কারিগর ছিল না, বরং পরিস্থিতির সফল ব্যবহারকারী ছিল। যদিও বিপ্লবের ফসল তাদের ঘরে যায় সেটি স্বীকার করেন। বিপ্লব-পরবর্তী যুদ্ধগুলো তাদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছিল। যেমন:

➥ যখন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ইউরোপ জয় করতে বের হন, তখন রথচাইল্ডের পাঁচ ছেলে ইউরোপের পাঁচটি প্রধান শহরে (লন্ডন, প্যারিস, ভিয়েনা, নেপলস ও ফ্রাঙ্কফুর্ট) ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

➥ লন্ডনের নাথান রথচাইল্ড ব্রিটিশ সরকারকে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বিপুল অর্থ সরবরাহ করেছিলেন।

➥ কোনো রাজতন্ত্র বা বিপ্লবী সরকার দেউলিয়া হয়ে গেলে ব্যাংকিং সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা পর্দার আড়ালে তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।

➥ ফরাসি বিপ্লব রথচাইল্ডদের মতো ইহুদি পরিবারগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছিল। বিপ্লবের আগে ইউরোপের অনেক দেশে ইহুদিদের নাগরিক অধিকার ছিল না এবং তারা নির্দিষ্ট এলাকায় (ঘেটো) থাকতে বাধ্য হতো। ফরাসি বিপ্লবের সাম্য ও স্বাধীনতার আদর্শ এই বাধাগুলো ভেঙে দেয়, যার ফলে তারা ব্যবসায়িকভাবে আরও বড় হওয়ার সুযোগ পায়।

ফরাসি বিপ্লব থেকে ইউরোপে অন্যান্য বিপ্লব, সৌদ পরিবারের উত্থান ও ইসলামি বিপ্লব, আরব বসন্ত থেকে জুলাই বিপ্লব; প্রতিটি বিপ্লব ঐসব ইহুদি পরিবারগুলোর জন্য শতাদ্বীর পর শতাব্দী ধরে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করে। সর্বোপরি তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হয়েছে।

বিপ্লব যখন গ্লোবাল এলিটদের অস্ত্র

অনেক গবেষক এবং তাত্ত্বিক মনে করেন, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব এমনকি প্রতিটি বড় বড় বিপ্লব এবং বিশ্বযুদ্ধগুলোও একটি নির্দিষ্ট “অদৃশ্য শক্তির” দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই মতবাদের মূল ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং এজেন্ডা বাস্তবায়ন। একদিকে ব্যাংকগুলো এমনভাবে ঋণ দেয় যাতে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জালে আটকে থাকে এবং তাদের সম্পদ ধনকুবেরদের হাতে চলে যায়। অন্যদিকে আর্থিক খ্যাতের নিয়ন্ত্রণ ও ঋণের ফাদে ফেলে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। যে হাজার বছরের পরিকল্পিত এজেন্ডার চূড়ান্ত রূপ হলো একটি একক বিশ্ব ব্যবস্থা কায়েম করা। গ্লোবাল এলিটরা একটি “নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার” বা একক বিশ্ব ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য বিপ্লব ও যুদ্ধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে—এমন জোরারো দাবি এখন অনেকের কাছে স্পষ্ট।

বিপ্লব এবং ‘গ্লোবাল এলিটস’ বা বৈশ্বিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কটি বেশ জটিল এবং রহস্যাবৃত। খোলা চোখে দেখা যায় না। সাধারণ বিশ্লেষণ, মিডিয়া, আলাপ আলোচনায় বিপ্লবকে দেখানো হয় সাধারণ মানুষের বিদ্রোহ হিসেবে, প্রকৃত ঘটনা বুঝা যায় যখন দেখা যায় ফলাফল আর বিপ্লবীদের হাতে নেই। আশ্বর্যজনকভাবে এটিই অধিকাংশ বিপ্লবের বাস্তবতা যা মোটেও কাকতালীয় নয়। আসলে ব্যতিক্রম ছাড়া বৈশ্বিক প্রভাবশালীরাই পর্দার আড়াল থেকে বিপ্লবের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতির ফায়দা নেয়।

এই ধারনা এখন প্রতিষ্ঠিত, অধিকাংশ বিপ্লবই স্বতঃস্ফূর্ত নয় বরং এগুলো বৈশ্বিক শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠী বা দেশের মাধ্যমে ‘স্পন্সর’ করা বা মানুফ্যাকচার্ড বিপ্লব। একে প্রায়ই ‘কালার রেভল্যুশন’ বলা হয়। স্বার্থান্বেষী মহল এনজিও, মিডিয়া, বহুজাতিক কোম্পানিকে ব্যবহার করে সরকার বিরোধী আন্দোলন বা বিপ্লবে অর্থায়ন করে। লক্ষ্য থাকে এমন একটি শাসনব্যবস্থা আনা যা তাদের বাণিজ্যিক বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে। বিপ্লবের পর নতুন সরকার যখন ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, তখন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা বা গ্লোবাল ব্যাংকাররা উচ্চ সুদে ঋণ দিয়ে সেই দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

এসব বিপ্লব সবসময় নিচ থেকে (Bottom-up) আসে না; বরং উপর থেকে (Top-down) চাপিয়ে দেওয়া হয় যাকে বলে ‘এলিট-লেড রেভল্যুশন’। যখন গ্লোবাল এলিটসরা মনে করে বর্তমান কোনো সরকার তাদের বিশ্বায়ন বা মুক্ত বাজারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন তারা সুকৌশলে জনঅসন্তোষকে পুঁজি করে বিপ্লবের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বর্তমান যুগে এআই, সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে জনমত গঠন বা পরিবর্তন করা গ্লোবাল টেক এলিটসদের জন্য সহজ হয়ে গেছে, যা যেকোনো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এলিট-লেড রেভল্যুশনের বড় দিক হলো, এটি পুরনো এলিটদের সরিয়ে নতুন একদল ‘বিপ্লবী এলিট’ তৈরি করে। যারা ন্যায়ের কথা বলে বিপ্লব করে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারাই আবার গ্লোবাল এলিটদের অংশ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মিশেলসের মতে, যেকোনো সংগঠন বা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর (গ্লোবাল এলিট) মাধ্যমেই শাসিত হয়। ফলে বিপ্লব কেবল হাতবদল হয়, কিন্তু ‘এলিট’ শাসনের অবসান ঘটে না।

বিপ্লব ও গ্রেট রিসেট

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) এর মতো সংস্থাগুলো যখন আমূল পরিবর্তনের কথা বলে, তখন অনেকেই একে ‘এলিটদের বিপ্লব’ বা ‘টপ ডাউন’ বিপ্লব হিসেবে দেখেন। উপর থেকে (Top-down) চাপিয়ে দেওয়া এলিট-লেড রেভল্যুশনের সাম্প্রতিক অন্যতম উদাহরণ এটি। সমালোচকদের মতে, এটি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত মালিকানা কমিয়ে বড় কর্পোরেশন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা।

‘গ্রেট রিসেট’ (The Great Reset) এবং ‘বিপ্লব’ – এই দুটি শব্দ বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত আলোচিত এবং বিতর্কিত। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াব ২০২০ সালে এই ধারণাটি সামনে আনেন।

সহজ কথায়, গ্রেট রিসেট হলো বিশ্ব অর্থনীতি, সমাজ এবং রাজনীতিকে নতুন করে সাজানোর একটি প্রস্তাবনা। কোভিড পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদকে আরও টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার কথা বলা হলেও, সমালোচকরা একে দেখেন এক ধরনের ‘কর্পোরেট বিপ্লব’ হিসেবে। এলিটদের বিপ্লব বলার কারণ, প্রথাগত বিপ্লব আসে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে (Bottom-up), কিন্তু গ্রেট রিসেট আসছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধান, ধনকুবের এবং বহুজাতিক কোম্পানির সিইও-দের পক্ষ থেকে (Top-down) যা প্রযুক্তিনির্ভর একটি বৈশ্বিক পরিবর্তনের চেষ্টা, যা প্রথাগত বিপ্লবের সংজ্ঞাকেই বদলে দিচ্ছে। সত্যিই কি মানবজাতির কল্যাণে নাকি একদল গ্লোবাল এলিটদের পুরো পৃথিবীর ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তা নিয়ে ইন্টারনেট জুড়ে তথ্যের ছড়াছড়ি।

এর প্রধান তিনটি স্তম্ভ হলো:

➥ স্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজম: কোম্পানিগুলো কেবল মুনাফা দেখবে না, বরং পরিবেশ ও সমাজের দায়িত্ব নেবে।

➥ ডিজিটালাইজেশন: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা 4IR-এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও রোবটিক্সের ব্যাপক ব্যবহার।

➥ সবুজ অর্থনীতি: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসা।

গ্রেট রিসেটের একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত স্লোগান হলো – ‘You will own nothing and be happy.’ সমালোচকদের মতে, এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নিয়ে সবকিছু বড় কর্পোরেশন বা রাষ্ট্রের ভাড়ায় চালানোর একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা। এছাড়া ডিজিটাল আইডেন্টিটি এবং সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) চালুর মাধ্যমে মানুষের প্রতিটি আর্থিক লেনদেন ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। এটি এক ধরনের ‘ডিজিটাল স্বৈরতন্ত্র’ বা বিপ্লবের নামে বিপরীত মেরু প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।

গ্রেট রিসেট নিয়ে ইন্টারনেটে প্রচুর তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যেগুলোকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে প্রচার করা হয়, যা অনেক সময় মূল সমস্যাকে আড়াল করে দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, এখানে ভয়ের মূল কারণ হলো স্বাধীনতার সংকোচন। যদি বৈশ্বিক সংস্থাগুলো (যেমন- WEF, UN, WHO) কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তবে ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু হওয়া স্বাধীনতা, সাম্য, অধিকার বয়ানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে যাবে।

আরো একটি দিক হলো, ইতিহাসে দেখা গেছে, প্রকৃত বিপ্লব ঠেকানোর জন্য কখনও কখনও এলিটরা নিজেরাই কিছু সংস্কার নিয়ে আসে। গ্রেট রিসেটকেও অনেকে তেমন একটি কৌশল হিসেবে দেখেন – যাতে সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ করার আগেই পরিবেশ বা সামাজিক ন্যায়ের নামে পুরো ব্যবস্থাকে এমনভাবে বদলে ফেলা যায় যেখান থেকে আর বের হওয়া সম্ভব হবে না।

রূপান্তরমূলক বিপ্লব: এজেন্ডা ২০৩০

একদিকে এজেন্ডা ২০৩০ (Agenda 2030) কে জাতিসংঘ পৃথিবীর উন্নতির জন্য একটি ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’ হিসেবে প্রচার করে, অন্যদিকে সমালোচকরা একে গ্লোবাল এলিটদের চাপিয়ে দেওয়া একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশ মিলে Sustainable Development Goals (SDG) বা ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা। এর মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং বৈষম্য দূর করা। ফরাসি বিপ্লবের যে বয়ান ছিল সেগুলোরই চূড়ান্ত রূপ বলা যায়। জাতিসংঘের ভাষায় এটি একটি রূপান্তরমূলক বিপ্লব (Transformative Revolution)। ২০১৫ সালে গৃহীত “Transforming our world: the 2030 Agenda for Sustainable Development” নথিতে সরাসরি রূপান্তর শব্দ ব্যবহার করে বিশ্বনেতারা এই এজেন্ডাকে একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেন।

এটি কোনো ছোটখাটো সংস্কার নয়; বরং পুরোনো ব্যবস্থার ভিত্তি উপড়ে ফেলে নতুন এক কাঠামোর জন্ম দেয় যা রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক—সব ক্ষেত্রেই এর ঢেউ লাগে। কিন্তু এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি প্রথাগত বিপ্লবের মতো নিচ থেকে নয়, বরং উপর থেকে (Top-down) রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অর্থাৎ এলিট-লেড রেভল্যুশন।

প্রথাগত বিপ্লব বলতে আমরা বুঝি বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন যা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এজেন্ডা ২০৩০-কে অনেকে প্রতি-বিপ্লব বা নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তনের একটি ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে দেখেন। সমালোচক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এজেন্ডা ২০৩০ আসলে একটি সামাজিক প্রকৌশল (Social Engineering) যা নিচের ক্ষেত্রগুলোতে বিপ্লব আনতে চায়:

➥ কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা: বিপ্লব সাধারণত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ চায়। কিন্তু এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি দেশের নীতি নির্ধারণে জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পায়।

➥ সার্বভৌমত্ব বনাম বৈশ্বিক লক্ষ্য: একটি দেশের জনগণ যদি তাদের নিজস্ব ধারায় পরিবর্তন (বিপ্লব) চায়, এজেন্ডা ২০৩০-এর বৈশ্বিক বাধ্যবাধকতা অনেক সময় সেই দেশীয় আকাঙ্ক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেমন ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং এলজিবিটিকিউ এর বিরুদ্ধে মুসলিম দেশের অবস্থান এজেন্ডা ২০৩০ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কিন্তু নারী অধিকারের ব্যানারে এলজিবিটিকিউ প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা তাদের রূপান্তর প্রক্রিয়ার একটি অংশ।

➥ অর্থনৈতিক পরিবর্তন: ‘গ্রেট রিসেট’-এর মতোই এজেন্ডা ২০৩০-এ টেকসই উন্নয়নের নামে ব্যক্তিগত ভোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ (The End of Ownership) আনার কথা বলা হয়েছে। কার্বন ট্যাক্স বা স্মার্ট সিটি (15-minute cities) পরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষের চলাফেরা ও সম্পদ ব্যবহারের ধরনে বিপ্লব আনার চেষ্টা চলছে।

➥ ডিজিটাল বিপ্লব ও নজরদারি: লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৯ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম নিবন্ধনসহ সকলের জন্য আইনি পরিচয় (Legal Identity) নিশ্চিত করা। পদ্ধতিগত আধুনিকায়নের কথা বলে জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো “Legal Identity” নিশ্চিত করার জন্য কাগজ-কলমের পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিকে উৎসাহিত করছে এবং দেশগুলোকে এমন সব আইডেন্টিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরির পরামর্শ দেয় যা ইন্টারঅপারেবল বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাথে সংযুক্ত। এর ধারাবাহিক চূড়ান্ত রূপ হলো ডিজিটাল আইডি। এটি জননিরাপত্তার কথা বললেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে এটি জনগণের ওপর রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বা ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’ তৈরির একটি বিপ্লব।

➥ খাদ্য ও কৃষি বিপ্লব: এজেন্ডা ২০৩০-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কৃষি ব্যবস্থাকে কর্পোরেট ও প্রযুক্তিনির্ভর করার একটি গোপন প্রচেষ্টা রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন, যা স্থানীয় কৃষকদের স্বনির্ভরতাকে নষ্ট করতে পারে। হাইব্রিড ও জিএমও ফসলের বাজার দখল, দেশীয় বীজ উধাও হয়ে যাওয়া, কৃষকের বীজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো যার বাস্তব উদাহরণ।

জাতিসংঘ এসডিজি ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা এজেন্ডা ২০৩০ এর রূপান্তরের ধরন
এসডিজি ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার আড়ালে লুকিয়ে আছে এজেন্ডা ২০৩০ এর রূপান্তরের প্রকৃত ধরন যা ২০১৭ সালে একদল গবেষক উন্মোচন করে, যা সারা বিশ্বের মানুষের কাছে এখন স্বীকৃত সত্য। কারণ লিংকের ভিডিওতে দেখানো বাম দিকের নাকি ডান দিকের এজেন্ডা বাস্তবায়ন হয়েছে তা এখন তাদের কাছে পরিষ্কার। ব্রিটিশ রাজনৈতিক দল ও খোদ আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ; দুনিয়াজুড়ে অসংখ্য মানুষ এখন এর বিরুদ্ধে সোচ্চার।

এজেন্ডা ২০৩০ সফল করতে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থ্যা এবং বড় বড় বিলিয়নেয়ার ফাউন্ডেশনগুলো অর্থায়ন ও নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তাদের যুক্তি হলো, পৃথিবী রক্ষার জন্য এই বিপ্লব অনিবার্য। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা কতটুকু থাকবে? বিপ্লব মানে যদি হয় মুক্তি, তবে এজেন্ডা ২০৩০-কে অনেকেই একটি “ডিজিটাল ও কর্পোরেট খাঁচা” হিসেবে দেখেন।

অনেক সমালোচকদের মতে ইউএন এজেন্ডা ২০৩০ এর সাথে সমন্বয় রেখে আরো বহু প্রকল্প চলমান যেখানে যুদ্ধ ও সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে শুরু করে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সবই অন্তর্ভুক্ত; যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা আছে।

এজেন্ডা ২০৩০-এর কিছু নীতির বিরুদ্ধে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিরোধ বিপ্লব শুরু হয়েছে। উন্নত বিশ্বে অসংখ্য মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় এজেন্ডা ২০৩০ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। ইউরোপে ডিজিটাল আইডির বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। নেদারল্যান্ডস, জার্মানি বা ভারতে কৃষকদের যে আন্দোলন, তার অনেকগুলোর মূলে ছিল এজেন্ডা ২০৩০-এর পরিবেশগত কঠোর নীতিমালার বিরোধিতা। কিন্তু এজেন্ডা ২০৩০ যে রূপান্তরমূলক বিপ্লব সেটি বুঝতেই দেরি হয়ে যায়। ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা ধরে রূপান্তর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সফলতার চূড়ান্ত ধাপে পৌছেছে। এই বিপ্লবও প্রায় সফলতার দিকে এগিয়ে গেছে তাদের কাছে যারা ফরাসি বিপ্লবেও সফল হয়েছিল।

ম্যানুফ্যাকচারড বিপ্লব

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের যুক্তি অনুযায়ী আধুনিক অধিকাংশ বিপ্লব কোনো অভ্যন্তরীণ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ফলাফল নয়। বরং এগুলো ‘পলিটিক্যাল টেকনোলজি’ বা সুপরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে তৈরি করা হয় যেগুলোকে ম্যানুফ্যাকচারড রেভল্যুশন (Manufactured Revolution) বা কৃত্রিম বিপ্লব বলা হয়। অনেক সময় স্বৈরাচারী সরকার তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হওয়া বৈধ আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে সেটিকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বা ‘ম্যানুফ্যাকচারড’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কখন কোনটি সত্য তা বিপ্লবের ফলাফল থেকে সহজেই বের করা সম্ভব। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো দেশের জনগণের মধ্যে সত্যি সত্যিই ক্ষোভ আছে, আর সেই ক্ষোভকে কোনো বিদেশি প্রভাবশালী শক্তি একটি কাঠামোর মধ্যে এনে কেবল কাজে লাগাচ্ছে। একে বলা হয় ‘অ্যালয়ড রেভল্যুশন’ বা মিশ্র বিপ্লব।

ম্যানুফ্যাকচারড বিপ্লব চেনার উপায়

এটি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন, কারণ অধিকাংশ বিপ্লবেই প্রকৃত জনক্ষোভের সাথে বাইরের পরিকল্পনার সংমিশ্রণ থাকে। তবে বিশ্লেষকরা নিচে উল্লেখিত বেশ কিছু সূচক বা প্যাটার্নের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন।

➥ যদি দেখা যায় কোনো আন্দোলন হঠাৎ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরিত হয়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগ বা ইস্যু খুব অল্প সময়ে অস্বাভাবিকভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় (বিশেষ করে পশ্চিমা গণমাধ্যম) ট্রেন্ড হয়ে যাওয়া। একই বার্তা বা স্লোগান হাজার হাজার ভুয়া বা নতুন তৈরি হওয়া অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা। স্থানীয় সাধারণ মানুষের চেয়ে যখন বড় বড় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বা বিদেশি মিডিয়া হাউজ অস্বাভাবিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট আন্দোলনের প্রতি প্রচারণা চালায়।

➥ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে লজিস্টিক সাপোর্ট (যেমন—খাবার, ব্যানার, সাউন্ড সিস্টেম, পরিবহন) গড়ে উঠতে সময় লাগে। কিন্তু যদি দেখা যায় আন্দোলনের শুরু থেকেই অত্যন্ত আধুনিক, ব্যয়বহুল এবং সুসংগঠিত লজিস্টিকস ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে তা সন্দেহের উদ্রেক করে। মানুষের হাতে একই ধরনের পেশাদার ডিজাইনের স্লোগানযুক্ত প্লাকার্ড থাকা। নিখুঁত যোগাযোগ ব্যবস্থা যা কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার মতো মনে হয়।

➥ স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানে সাধারণত দাবির বহুমুখিতা থাকে। কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারড রেভল্যুশনের ক্ষেত্রে ‘সিঙ্গেল-পয়েন্ট ফোকাস’ লক্ষ্য করা যাবে। সব দাবিকে এড়িয়ে কেবল নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দিকে মনোযোগ থাকে। এবং আন্দোলন বেগবান হওয়ার সাথে সাথেই একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প নেতৃত্বের নাম বা গোষ্ঠীর নাম সামনে চলে আসা।

➥ এনজিও, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা, শক্তিশালী কোনো দেশের আর্থিক ও কৌশলগত সহায়তার সরাসরি প্রভাব দেখা যায়। আন্দোলনের সাথে যুক্ত এনজিও, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন, ভাড়াটে বিপ্লবী ও ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন লক্ষ্য করা যেতে পারে।

রঙ্গিন বিপ্লব

প্রতিবাদের চিহ্ন হিসেবে মানুষ নির্দিষ্ট কোনো রং বা প্রতীক ব্যবহার করায় এগুলোকে কালার রেভল্যুশন (Color Revolution) বা রঙিন বিপ্লব বলে। ২০০৩ সালে জর্জিয়ার রোজ রেভল্যুশন, ২০০৪ সালে ইউক্রেনের অরেঞ্জ রেভল্যুশন, ২০০৫ সালে কিরগিজস্তানে টিউলিপ রেভল্যুশন, ২০০৫ সালে লেবাননে সিডার (আপেল সিডার) রেভল্যুশন এবং ২০১০ সালে তিউনিসিয়ার জেসমিন রেভল্যুশন থেকে আরব বসন্ত। পশ্চিমা দেশ এগুলোকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের মুক্তি হিসেবে দেখে। ঐ যে ফরাসি বিপ্লবের বয়ানের ধারাবাহিকতা! অপরদিকে রাশিয়া এবং তাদের মিত্র দেশ এই আন্দোলনগুলোকে ‘ম্যানুফ্যাকচারড রেভল্যুশন’ বা পশ্চিমা মদদপুষ্ট ‘পরিকল্পিত অভ্যুত্থান’ হিসেবে মনে করে। তাদের অভিযোগ, এগুলো আসলে সিআইএ (CIA) বা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং এনজিওর অর্থায়নে পরিচালিত এক ধরণের ‘সফ্ট পাওয়ার’ কৌশল, যার উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোকে অস্থিতিশীল করা এবং রাশিয়া পন্থি বা রাশিয়ার কৌশলগত মিত্রদের ক্ষমতাচ্যুত করে সেখানে পশ্চিমা প্রভাব বাড়ানো।

বিপ্লব ও প্রযুক্তির ফাঁদ

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর যুদ্ধ ও বিপ্লব এখন আর কেবল সায়েন্স ফিকশন নয়, এটি আধুনিক রণকৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে প্রায়ই ‘চতুর্থ বা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটি কেবল সীমান্তে নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্ক, অর্থনীতি এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোতে সমানভাবে চলে যা সম্পূর্ণ অদৃশ্য। আপনি হয়তো জানবেনই না যে আপনার দেশ একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, অথচ আপনার অর্থনীতি ধসে পড়ছে এবং সমাজে চরম বিভাজন তৈরি হচ্ছে—সবই হচ্ছে পর্দার আড়ালে থাকা এআই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে।

প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে একটি কৃত্রিম গণজাগরণ তৈরি করা যায় এবং এর মাধ্যমে গ্লোবাল এলিটসরা কীভাবে জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

অ্যাস্ট্রোটার্ফিং এবং এআই

‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ (Astroturfing) শব্দটি এসেছে আমেরিকান কোম্পানি ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফ’ থেকে। অ্যাস্ট্রোটার্ফ হলো এক ধরনের কৃত্রিম ঘাসের কার্পেট। অর্থাৎ এটি সত্যিকারের ঘাস নয়, বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি ঘাস। বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল টাকা খরচ করে এমন একটি কৃত্রিম জনমত বা আন্দোলনের আবহ তৈরি করে, যেন মনে হয় এটি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ বা মতামত – এটিকেই অ্যাস্ট্রোটার্ফিং বলা হয়। সহজ কথায় এটি হলো ‘কৃত্রিম ঘাস’ বা ‘ফেক গ্রাসরুটস’ মুভমেন্ট বা পরিকল্পিত নাগরিক আন্দোলন। এটিকে সাম্প্রতিক ম্যানুফ্যাকচারড রেভল্যুশনের অন্যতম কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণ বিপ্লব হয় স্বতঃস্ফূর্ত (Grassroots)। কিন্তু এআই-এর মাধ্যমে এখন ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং করা হয়, যেখানে হাজার হাজার ফেক সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল বা ‘বট’, পেইড ইনফ্লুয়েন্সার বা ভাড়া করা লোকদের ব্যবহার করে ইন্টারনেটে এমন একটি আবহ তৈরি করা হয় যেন মনে হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ কোনো একটি নির্দিষ্ট দাবিতে সোচ্চার। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনের দাবি নিয়ে ঠিক এ কাজটিই করা হয়েছিল। ২০১০ সালে তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব থেকে শুরু হয়ে আরব বসন্তসহ সাম্প্রতিক গণজাগরণগুলোতে একই কৌশলের সহায়তা নেয়া হয়। সাধারণ মানুষ যখন দেখে অনলাইনে সবাই একই কথা বলছে, তখন তারা ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ -এর শিকার হয়ে সেই মিথ্যা বিপ্লবে যোগ দেয়। ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট (Bandwagon Effect) হলো মনোবিজ্ঞানের একটি ধারণা, যেখানে কোনো ব্যক্তি কোনো কাজ কেবল এই কারণেই করে কারণ অন্য অনেক মানুষ সেটি করছে। সহজ কথায়, ‘হুজুগে মাতাল’ প্রবণতা। এ থেকে প্রলুব্ধ হয়ে ভার্চুয়াল জগৎ থেকে মানুষ বাস্তব জগতে অর্থাৎ রাস্তায় নেমে আসে। প্রযুক্তির এই ভেলকিবাজির সাথে যুক্ত থাকে বিশেষ প্রশিক্ষিত হিউম্যান এজেন্ট।

অ্যাস্ট্রোটার্ফিং পরিকল্পিত বিপ্লব প্রক্রিয়া

আগে অ্যাস্ট্রোটার্ফিং করতে প্রচুর লোকবল, সময় ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হতো। কিন্তু জেনারেটিভ এআই (Generative AI) এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে কয়েকগুণ শক্তিশালী, সাশ্রয়ী ও সহজ করে তুলেছে। একই সাথে চক্রান্ত শনাক্ত করাও সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত উপরের চিত্রটিতে দেখুন, অ্যাস্ট্রোটার্ফিং বিপ্লবের মূল উৎসও হলো অর্থায়ন, যে অর্থ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বিপ্লব সংঘঠিত হচ্ছে ফরাসি বিপ্লব থেকে এবং যা আজও বহাল আছে।

বিপ্লব সফল করতে শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, ভিডিও ও ছবির প্রয়োজন হয়। এআই এখন এমন সব ছবি বা ভিডিও (Deepfakes) তৈরি করতে পারে যা দিয়ে বিপ্লবের আবেগ উসকে দেওয়া সম্ভব। কোনো দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর নামে মিথ্যা নির্যাতনের ভিডিও তৈরি করে দাঙ্গা বা বিদ্রোহ লাগিয়ে দেওয়া সম্ভব। জনপ্রিয় নেতার কণ্ঠ নকল করে ভুল নির্দেশ দিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপ দেওয়া যেতে পারে। আন্দলোনরত সাধারণ মানুষ হত্যার ভিডিও বানিয়ে আন্দোলনকে উসকে দেয়া হতে পারে।

এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে একটি দেশের মানুষের ক্ষোভের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হয়। এরপর সুনির্দিষ্টভাবে সেই মানুষের কাছে এমন কন্টেন্ট পৌঁছানো হয় যা তাকে রাস্তায় নামতে প্ররোচিত করে। কোনো একটি ন্যায্য আন্দোলন যখন গতি পায়, তখন এআই নিয়ন্ত্রিত প্রচারণার মাধ্যমে সেই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বদলে দেওয়া হয় এবং নিজেদের পছন্দের এজেন্ডা বা ‘এজেন্ডা ২০৩০’ -এর লক্ষ্যগুলো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

এআই-কে ব্যবহার করে এখন কোনো রক্তপাত ছাড়াই একটি দেশের সরকার ফেলে দেওয়া বা জনমত বদলে দেওয়া সম্ভব। একে বলা হয় ‘কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার’। আপনি যদি এই এআই-নির্ভর যুগে সচেতন না থাকেন, তবে আপনার আবেগকেও গ্লোবাল এলিটসরা তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

যার হাতে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল এবং বড় ডেটাসেট থাকবে, সে-ই যুদ্ধের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে নিয়ে যাচ্ছে। এআই-কে ব্যবহার করে কোনো দেশে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি করা বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনা গ্লোবাল এলিটদের জন্য এখন অনেক সহজ।

এআই বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায় হলো মানুষের শরীরের সাথে প্রযুক্তির একীভূত হওয়া অর্থাৎ ট্রান্সহিউম্যানিজম। নিউরালিংকের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক সরাসরি এআই-এর সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দিলেও মানুষের ‘স্বতন্ত্র সত্তা’ কেড়ে নিবে।

যদি এআই-কে শোষণের হাতিয়ার করা হয়, তবে ভবিষ্যতের বিপ্লবীরাও এআই-কেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবে। যাকে বলে ‘কাউন্টার-এআই রেভল্যুশন’। নিজস্ব এআই মডেল তৈরি করা, অ্যালগরিদমকে ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি উদ্ভাবন, এনক্রিপশন ও বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ভাঙার চেষ্টা হবে এআই কাউন্টার রেভল্যুশনের মাধ্যমে।

‘আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী দিয়ে লড়া হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ লড়া হবে পাথর আর লাঠি দিয়ে।’ – আইনস্টাইনের এই উক্তিটি এখন আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ এআই নির্ভর যুদ্ধ মানব সভ্যতাকে আদিম যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

বিপ্লবের ইন্ড গেম তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্র পতন শুরু হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা পায়। ফরাসি বিপ্লব থেকে জুলাই বিপ্লবসহ আজ অবধি একই ধারার যত যুদ্ধ ও বিপ্লব সংগঠিত হয় তার পূর্ণতা দেয়ার মহাপরিকল্পনা হলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এবারেরটি নব্বইয়ে উপসাগরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শেষ করার ৪০ বছরের মহাপরিকল্পনা। এই ৪০ বছর একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ ও সমীকরণ যা সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। এই সময়ের মধ্যে এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য হুমকি হতে পারে এমন দেশ এবং লিডারদের চিহ্নিত করা এবং একে একে ধ্বংস করা হয়। ইরাক এবং সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়া এবং গাদ্দাফি, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ রাশিয়ার সীমান্তবর্তী দেশ ও তাদের কৌশলগত মিত্র লিডার ও সরকাররা এই টার্গেটের অন্যতম উদাহরণ। অন্যদিকে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ভেতর থেকে সভ্যতার রূপান্তরের জন্য প্রথমে এমডিজি (২০০০-২০১৫ সাল) এবং পরে এসডিজি প্রকল্প এবং সবশেষ দ্যা গ্রেট রিসেট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। উভয় প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩০ সাল। এরই মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘন্টাও বেজে গেছে, কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি আছে মাত্র।

পরিকল্পিত বিপ্লবের ইন্ড গেম তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। সংক্ষেপে আবারো কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করছি:

➥ পারমাণবিক এবং এআই-চালিত যুদ্ধের যুগে কোনো একক পক্ষ জয়ী হতে পারে না। যখন এক পক্ষ ধ্বংস হওয়ার মুখে পড়বে, তখন তারা তাদের সম্পূর্ণ পারমাণবিক মজুত ব্যবহার করবে। ফলে কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হবে না; কেবল উভয় পক্ষ এবং পুরো পৃথিবী একটি “নিউক্লিয়ার উইন্টার” বা পারমাণবিক শীতের কবলে পড়বে।

➥ তাত্ত্বিকভাবে, যদি এআই নিজেই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে (যেমনটি আমরা হাইপার-ওয়ার বা অ্যালগরিদমিক যুদ্ধে দেখি), যুদ্ধ তখন কেবল একটি গাণিতিক ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হবে। এআই এবং উন্নত প্রযুক্তির তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর পরিবেশ এবং মানুষের ডিএনএ-তে এমন স্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে যে, পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত কোনো সুস্থ সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে না। একে বলা হয় “Pyrrhic Victory” বা এমন এক জয় যা পরাজয়ের চেয়েও ভয়াবহ।

➥ জীবাণু যুদ্ধ বা ব্যায়োলজিক্যাল ওয়্যারফেয়ারের নামে ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোনো অণুজীব এবং টক্সিনকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিণতি প্রচলিত অস্ত্রের চেয়ে কম নয়। কারণ জৈব অস্ত্র কোনো দেশের সীমানা মেনে চলে না। বাতাস বা মানুষের যাতায়াতের মাধ্যমে খুব দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি যারা এই অস্ত্র ব্যবহার করবে, তারাও শেষ পর্যন্ত এর শিকার হতে পারে।

➥ আবহাওয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পনিণতি হবে ভয়াবহ যদিও সেটিই করা হচ্ছে। আগের লেখায় বিস্তারিত উল্লেখ করি। আবহাওয়া যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিণতি হলো ‘হয় জিতব, না হয় ধ্বংস হব’ এমন কোনো জয়ী পক্ষ থাকবে না। এটি একটি ‘জিরো-সাম গেম’ (Zero-sum game), যেখানে পুরো পৃথিবীই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেহেতু প্রকৃতি কারো একক নিয়ন্ত্রণে নয়, তাই আবহাওয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে তা উল্টো ব্যবহারকারী দেশের ওপরই আঘাত হানার সম্ভাবনা প্রবল। যেমনটি আমেরিকার ক্ষেত্রে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

প্রচলিত অস্ত্রের পাশাপাশি এআই, পরমাণু অস্ত্র, জীবাণু অস্ত্র, আবহাওয়া অস্ত্র ইত্যাদি যে অস্ত্র প্রয়োগ করুক না কেনো, বিশ্লেষকদের মতে গ্লোবাল এলিটদের পরিপূর্ণ লক্ষ্য বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এলিটরা সরাসরি বিজয় চায় না, তারা চায় ‘অর্ডার আউট অফ কেওয়াস’ (Order out of Chaos)। অর্থাৎ একটি বড় ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা, যাতে মানুষ নিজেই বাঁচার তাগিদে একটি বৈশ্বিক সরকার বা কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়। যুদ্ধের অরাজকতার দোহাই দিয়ে সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) এবং ডিজিটাল আইডি বাধ্যতামূলক করা সহজ হয়। যুদ্ধের ফলে ছোট দেশ ও সাধারণ মানুষের সম্পদ মূল্যহীন হয়ে পড়বে, যা বড় বড় কর্পোরেশন ও এলিটসদের হাতে চলে যাবে।

কিন্তু গ্লোবাল এলিটদের স্বার্থ ও বাস্তবতার মধ্যে অনেক ফারাক। মহাপরিকল্পনা ও সবশেষ যে যুদ্ধের মাধ্যমে একটি গ্রেট রিসেট বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা আনতে চায়, সেই প্রাথমিক মহাপরিকল্পনার (রূপান্তমূলক বিপ্লব) অধিকাংশ সফল হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এতই ব্যাপক হতে পারে, যে অবকাঠামো বা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেই ব্যবস্থাই ধসে পড়বে। বাঙ্কারে বসে দীর্ঘ সময় পৃথিবী শাসন করা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, এক সময় তারা নিজেরাই সেই বিশৃঙ্খলার আগুনে ভস্মীভূত হয়। বিশৃঙ্খলা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তথাকথিত পরিকল্পিত বিপ্লব বা যুদ্ধ ব্যর্থ হতে বাধ্য। কারণ বড় মাপের যুদ্ধ বা বিপ্লব সবসময় পরিকল্পনামাফিক চলে না। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা যুদ্ধ পরবর্তী এজেন্ডা বাস্তবায়ন তাদের পরিকল্পনামাফিক চলবে না এটা এস্কেটোলজিক্যাল দলিল দ্বারা প্রমাণিত। কেবল একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত তাদের পতন নিশ্চিত করবে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রপাগান্ডার টুল হিসেবে এআই এর ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এর নেওয়া একটি স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত এমন ধ্বংসলীলা চালাতে পারে যা এলিটসদের নিজেদের বাঁচার পরিবেশকেও ধ্বংস করে দেবে। এছাড়া ইতিহাস সাক্ষি, যখন মানুষকে একদম দেয়ালের পিঠে ঠেকিয়ে দেওয়া হয়, তখন তারা সব ধরণের সিস্টেমের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহ করে। গ্লোবাল এলিটসদের প্রযুক্তিগত নজরদারি থাকা সত্ত্বেও গণ-বিদ্রোহ বা ‘গেরিলা রেজিস্ট্যান্স’ তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে পারে। এছাড়া এলিটরা কোনো একক সত্তা নয়। তাদের মধ্যেও স্বার্থের সংঘাত আছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা যখন চরমে পৌঁছাবে, তখন তাদের অভ্যন্তরীণ কামড়াকামড়ি এজেন্ডা ২০৩০ এর লক্ষ্যকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।

একটি প্রশ্ন থেকে যায়, যদি তারা সফল হয়ও, তবে সেই পৃথিবীতে কি মানুষের কোনো ‘প্রাণ’ বা ‘স্বতন্ত্র সত্তা’ অবশিষ্ট থাকবে, নাকি সবাই কেবল একটি বড় অ্যালগরিদমের অংশ হয়ে যাবে?

তাত্ত্বিকভাবে তাদের পরিকল্পনা অনেক শক্তিশালী এবং এখন পর্যন্ত অসম্ভব ছন্দের মতো এগিয়ে যাচ্ছে মনে হলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘অদৃশ্য বাধা’ রয়েছে। অদৃশ্য বাধাটি উপরের আলোচনার কোনটিই নয়। এই অদৃশ্য বাধা হলো আধ্যাত্নিকতা।

আগামীর বিপ্লব ও জয় পরাজয়

কেমন হবে আগামীর বিপ্লব? সশস্ত্র বিপ্লব, অহিংস বিপ্লব, সহিংস বিপ্লব, অভ্যুত্থান, শিল্প বিপ্লব, সবুজ বিপ্লব, বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব, বুর্জোয়া বিপ্লব, রঙ্গিন বিপ্লব, সাংস্কৃতিক বিপ্লব, নারীবাদী বিপ্লব, এলজিবিটি বিপ্লব… নাকি একযোগে সবকিছুর সমন্বিত বিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে? যদি প্রশ্ন করা হয় সাধারণ বিশ্ববাসীর কি করা উচিত? তবে উত্তর হবে তাই করা উচিত যা কুশিলবরা করতে দিতে চায়না। যদি ডানে যেতে বলে যেতে হবে বামে। যা তারা চাপিয়ে দিতে চায় তার বীপরিত করা উচিত। যে যুদ্ধ তারা চাপিয়ে দিতে চায়, যে খাবার তারা চাপিয়ে দিতে চায়, যে জীবনদর্শন, যে লাইফস্টাইল, যে ধর্ম, যে মুদ্রা ব্যবস্থা, যে যান্ত্রিকতা, যে ইনক্লুসিব সমাজের নামে নতুন নতুন প্রযুক্তি নির্ভর দাসত্ব ব্যবস্থাকে চাপিয়ে দিতে চায়, বিপ্লব সেগুলোর বিরুদ্ধে হওয়া উচিত।

আগেও উল্লেখ করি, আগামীর বিপ্লব ও যুদ্ধ হবে দুই ধরনের। একটি সামরিক আরেকটি আধ্যাত্নিক। সুস্পষ্টভাবে আবারো জেনে রাখুন প্রথম ধাপের সামরিক মোকাবিলা মুমিনদের জন্য নয়। মুসলমানদের একটা উদ্র শ্রেণীকে শয়তানবাদীরা প্রস্তুত করেছে জিহাদের জন্য নয়। বরং মুসলমান-মুসলমান দাঙ্গা লাগিয়ে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য। কনট্রলড অপোজিশন ও ফলস এনিমির ভূমিকা পালনের জন্য। ডিপপুলেশন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য তারা চায় চরম অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে মুসলমানরা ঝাপিয়ে পরুক। মিথ্যা বিপ্লবের বারুদ অন্তরে গেঁথে দিতে চায়। আবার উগ্র নয় কিন্তু বিভ্রান্ত আরেকটা শ্রেণীকে প্রস্তুত করা হয়েছে ইসলামকে ভেতর থেকে বিতর্কিত অবস্থানে নেয়ার জন্য। উভয়ে ইসলামের হয়ে কাজ করে। ইসলামি এই সংস্কার যাত্রা শুরু হয় ওয়াহাবি আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৭৪০-এর দশকে) বর্তমান সৌদি আরবের নাজদ অঞ্চলে। সালাফি আন্দোলন, ওয়াহাবি আন্দোলন, অটোমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান, সৌদ পরিবারের সাথে চুক্তি এবং ১৯৩২ সালে সৌদি আরবের জন্ম। প্রথমে ব্রিটিশ এবং পরে আমেরিকা অর্থাৎ পশ্চিমা সহায়তায় ইসলামের কথিত সংস্কারযাত্রা এবং সৌদ পরিবারের নামে নামকরণ করে সৌদি আরবের উন্থান! ইসলামি সশস্ত্র সংগঠন, ইসলামি রাজনৈতিক দল, ইসলামি অর্থ ব্যবস্থা, ইসলামি আন্তর্জাতিক সংস্থা; সবখানে একই ধারার কথিত ইসলামি সংস্কার, বিপ্লব, সংগ্রাম। এমনকি কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ইসলামি সেলিব্রিটি, বক্তা, স্কলাররাও একই ধারার সংস্কার যাত্রার অনুসারি। এতোকিছুর পরও সংস্কারের দেখা মিলেনি। এর অর্থ মুসলমানদের বড় ধরনের কোথাও ভুল হয়েছে। এই ভুল সংশোধন করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী যুদ্ধ ও বিপ্লবেও চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে।

এতোকিছুর মধ্যে সাধারন মুমিনদের চলার রাস্তা খুবই সংকীর্ণ। যদি প্রশ্ন করা হয় তারা কোন পথে চলবে? উত্তর হলো তারা মধ্যম পথে চলবে। পশ্চিমা গোপন সহায়তার কোন সংগঠন ও দলের অনুসারী নয়। কেবল কোরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করবে। বিশ্বাস করি বিভ্রান্ত ও ভুল মতাদর্শে বিশ্বাসীদের কথিত বিপ্লব যাত্রা শেষ হলেই ভিন্ন এক আধ্যাত্নিক মহাজাগরণ শুরু হবে। আর কখন গর্জে উঠতে হবে সেই বার্তা মুমিনদের কানে আল্লাহ পৌছে দিবেন ইনশাআল্লাহ।

যদি প্রশ্ন করা হয় কথিত ভূয়া বিপ্লব চলাকালীন প্রকৃত বিপ্লবীদের করণীয় কি? প্রতিটি ক্ষত ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়ে আছে। এজেন্ডা ২০৩০ সম্পর্কে আমাদেরকে ভুল বুঝানো হয়েছে। সাম্য, অধিকার, মানবাধিকার, শান্তির নামে বিপরীতমুখী পরিবর্তন আনা হয়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু লোকদেখানো ভালো কাজের আড়ালে প্রকৃতপক্ষে ফিতরাত –এর পরিবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ সহজাত প্রকৃতি, আদি স্বভাব, প্রাকৃতিক গঠন, মেজাজ বা সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করা হয়। এটি হতে পারে খাবার-দাবার, কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বীজ ধ্বংস করে কৃত্তিম হাইব্রিড, জিএমও প্রযুক্তি ব্যবহার করে। হতে পারে সমান অধিকারের কথা বলে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অস্বীকার করে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ফিতরাতকে নষ্ট করে। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের আড়ালে কৃত্তিম আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলে উল্টা আরো ভারসাম্য নষ্ট করে। এরকম প্রতিটি বিপরীতমুখী পরিবর্তনের জলন্ত উদাহরণ এখন আমাদের চোখের সামনে। খাবারে পুষ্টি নেই, দেশীয় বীজ খুজে পাওয়া যায় না। নারী নির্যাতন কমেনি, বৈষম্য কমেনি বরং বেড়েছে। যুদ্ধ কমেনি বরং তা এখন চূড়ান্ত মাত্রায় এসে পৌছেছে। অথচ মানুষকে একটা মিথ্যা ঘোরের মধ্যে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে এজেন্ডা ২০৩০ এর মানবতার উন্নয়নের নামে। এখন সারা বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ এই রূপান্তরমূলক বিপ্লবের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ বিপ্লব শুরু করে দিয়েছে। এই প্রতি বিপ্লবের জন্য কোন গোলাবারুদ দরকার নেই, সামরিক প্রশিক্ষণ দরকার নেই। এ সময় প্রত্যেক মুমিন মুসলমান ও হক পথের যাত্রীদের উচিত চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং ফিতরাতকে ফিরিয়ে আনার জন্য শারীরিক ও আত্নিকভাবে প্রস্তুত হওয়া। নিচে কিছু লিংক দেয়া হলো:

এই সাইটগুলো চক্রান্ত বুঝতে সহায়ক হবে। যদিও অনেক কনটেন্ট এমন যেনো সমস্যাগুলোও মুসলমানদের তৈরি করা! সেগুলো এড়িয়ে বরং পশ্চিমাদের চক্রান্ত তাদেরই আরেক গ্রুপের মাধ্যমে জানার সবর্ণ সুযোগ হতে পারে এসব সাইট। বাংলা ভাষাতেও এরই মধ্যে অনেক সাইট আছে যা সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যকর খাবার ও প্রকৃতি নির্ভর জীবনব্যবস্থা নিয়ে অনেক ডাক্তার ও পুষ্টিবিদ কাজ করছেন। বীষমুক্ত কৃষি নিয়ে কাজ করছেন অনেক উদ্যোক্তা। প্রকৃতিক খাবার অনেকে প্রমোট করছেন ইকমার্সের মাধ্যমে। ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকলেও এ ধরনের উদ্যোগগুলোই হয়ত পরিবর্তনের আলামত। এভাবে প্রতিটি সেক্টর ধরে উদ্যোগ বাড়ানো এবং সমন্বয় প্রয়োজন।

আগামীর বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক কোনো পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি বিশাল আধ্যাত্মিক ও বৈশ্বিক রূপান্তর। তাদের চাপিয়ে দেয়া টপ ডাউন রূপান্তমূলক বিপ্লবের বীপরিত ফিতরাত নির্ভর বটম আপ বিপ্লব। এই চর্চা নিঃসন্দেহে একজন মানুষকে সৎ ও সঠিক পথে নিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ। কথিত বিপ্লব শেষে যিনি এই বৈশ্বিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দিবেন তিনি ও তার অনুসারীরাও অধ্যাত্নিক শক্তির অধিকারি হবেন। তাদের অন্তর্দৃষ্টি এতই প্রখর হবে যে তারা সমসাময়িক ধোঁকা বা ফিতনা সহজেই চিনতে পারবেন। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্য নয়, বরং এটি হবে একটি সার্বজনীন ব্যবস্থা পরিবর্তনের সংগ্রাম। ইতিহাসে অনেক বিপ্লবই কেবল বাহ্যিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে সফল হতে চেয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো মানুষের অন্তরে পরিবর্তন আনতে পারেনি। আগামীর বিপ্লবকে ‘আধ্যাত্মিক’ বলা হয় কারণ এটি অধ্যাত্নিক শক্তিবলেই সংগঠিত হবে এবং মানুষের চিন্তাধারা এবং আত্মিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে।

What do you think?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

GIPHY App Key not set. Please check settings

দাজ্জালের ধনভান্ডার, দুর্ভিক্ষ এবং আমাদের লাইফস্টাইল