in ,

LoveLove AgreeAgree

নতুন বিশ্ব গড়ার মহাপরিকল্পনা, বাস্তবতা এবং পরিণতি

নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার: তৃতীয় পর্ব

New World Order, World War 3 and New Map

নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা বা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বলতে নতুন কোন ইউনিপোলার সিস্টেমকে বুঝায়। এমন মতামতই বেশি প্রচারিত হয়ে আসছে। যেখানে এক রাজা, এক মুদ্রা, এক গর্ভন্যান্স, এক আর্মি ব্যবস্থা থাকবে। যেটি হবে প্রযুক্তি ভিত্তিক এবং কল্পিত থার্ড টেম্পল কেন্দ্রিক। অর্থাৎ এক রাজা কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা যেটা বর্তমান আমেরিকা কেন্দ্রিক ইউনিপোলার সিস্টেমকে নতুন শাসকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বিশ্বে চলমান বড় বড় ঘটনাগুলো এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মনে করা হচ্ছে অর্থাৎ আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের জেরুজালেমকেন্দ্রিক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু নতুন বিশ্ব বলতে কি শুধু এটিকেই বুঝায়? অন্য সব পরাশক্তিও কি একই লক্ষ্যে কাজ করছে? প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ওয়ার্ল্ড অর্ডার পরিবর্তন হয়ে যেভাবে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউনিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরি হয়, আরো একটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে কি এটি পরিবর্তন হয়ে ইসরায়েলের নেতৃত্বে নতুন ইউনিপোলার বিশ্ব তৈরি হবে? ক্লাব অফ রোমের কল্পিত ১০টি বৃহৎ আঞ্চলিক শক্তির বিভাজন কি এই পরিকল্পনার অংশ? নাকি নতুন মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থার আবির্ভাব হবে? নাকি ভিন্ন কিছু যা আমাদের কল্পনারও বাহিরে? কে জিতবে, কারা টিকবে, কার কোন পরিকল্পনা চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হবে এসব নিয়ে এবারের পর্যালোচনা।

বরাবরের মতো মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু বিষয় উল্লেখ থাকবে যেগুলো আপাত বিচ্ছিন্ন মনে হলেও সার্বিক দৃশ্যপট সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র ফুটিয়ে তুলতে সহায়ক হবে। গত লেখায় কনট্রলড অপোজিশন সম্পর্কে উল্লেখ ছিল। এবার থাকছে ফলস এনিমি সম্পর্কে। দুটি খুব কাছাকাছি ধারনা হলেও কিছু পার্থক্য আছে এবং প্রকৃত শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করে সঠিক সিন্ধান্ত নিতে এই দুটি বিষয় দারুণভাবে সাহায্য করবে। সবচেয়ে বড় বিষয় নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের মূল টার্গেট মুসলমানদের ধ্বংস করে কল্পিত নতুন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কুশিলবরা এই কৌশলগুলোকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সাধারণের অজান্তে প্রয়োগ করে একের পর এক লক্ষ্য অর্জন করে চলেছে। আর আমরা প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত হচ্ছি। কখনও পরাজয়কে বিজয় বলি, মিত্রকে শত্রু, শত্রুকে মিত্র বলি। অত্যন্ত দূরদর্শীতার সাথে আমাদেরকে শত্রু-মিত্রের গোলকধাঁধায় আটকে ফেলা হয়েছে। ফলে একের পর এক নিজেরা নিজেদের সাথে লড়াই করে এখন প্রায় নিঃশেষ হওয়ার উপক্রম।

ফলস এনিমি

এক কথায় যাকে আমরা শত্রু মনে করি, কিন্তু বাস্তবে সে প্রকৃত শত্রু নয় – সেটিই ফলস এনিমি। প্রাসঙ্গিক গভীরতায় এর বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। এটি মূলত রাজনীতি, যুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডার জগতে ব্যবহৃত এমন একটি কৌশল যেখানে সুপরিকল্পিতভাবে একটি দল বা গোষ্ঠীকে তৈরি করা হয় এবং এমনভাবে প্রচার করা হয় যাতে আসল শত্রু, আসল সমস্যা বা আসল উদ্দেশ্য গোপন থাকে। শত্রুরূপি এই গোষ্ঠী বা দল আসল শত্রুর সহায়ক বা শাখা দল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে যাতে আসল শত্রুর কোন নিশানাও খুজে পাওয়া না যায়। উদাহরণ হিসেবে কোন নাম উল্লেখ করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হতো। তবে ভালো ধারনা হয়ে গেলে পাঠক নিজেই যথাযথ ব্যক্তি ও দলকে বসিয়ে নিতে পারবে আশা করি। অপরদিকে এমনও হতে পারে সত্যিকার অর্থেই কোন দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রকৃত শত্রুর জন্য হুমকি কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় বা এমনভাবে উপস্থাপিত হয় যেন গণশত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়। এটিও ফলস এনিমি। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বা লিবিয়ার গাদ্দাফিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

এখানে দুই ধরনের ডাইমেনশন উল্লেখ করা হয়েছে যার মধ্যে প্রথমটি ফলস এনিমি ও কনট্রলড অপোজিশন দুটিই হতে পারে:

১. প্রকৃত শত্রুর তৈরি করা সহায়ক শক্তি = ফলস এনিমি
২. শত্রুর জন্য হুমকিস্বরূপ শক্তি কিন্তু ভুলভাবে উপস্থাপিত = ফলস এনিমি

ফলস এনিমি তৈরির উদ্দেশ্য

জনগণের মনোযোগ সরানো: ফলস এনিমি এমন একটি ষড়যন্ত্র, যেখানে পরিকল্পিতভাবে ভুল শত্রু তৈরি করে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে সরানো হয় – যাতে আসল শত্রু, আসল সমস্যা, বা আসল উদ্দেশ্য গোপন থাকে। এর ফলে জনগণ আসল সমস্যার দিকে না তাকিয়ে, তৈরি করা শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং লড়াইয়ে মনোযোগী হয়।

কোন সরকার দুর্নীতি ঢাকতে বা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতা ঢাকতে বিদেশি শত্রুর ভয় দেখায় যাতে জনগণ অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো ভুলে যায়। সরকার সাধারণ জনগণকে বুঝাতে থাকে যে যত সমস্যার মূল হলো ঐ দেশ। সেই বাইরের দেশটি তখন ফলস এনিমি।

ধরুন, কোনো দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। সরকার জনগণকে বোঝাচ্ছে যে ‘অভিবাসীরাই চাকরি নিচ্ছে’ – অথচ বাস্তবে মূল সমস্যা হয়ত নীতিগত ব্যর্থতা। এখানে ‘অভিবাসী’ হলো ফলস এনিমি।

আতঙ্ক সৃষ্টি: শত্রু তৈরি করা হলে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়, সশস্ত্র বাহিনীর তৎপরতা বেড়ে যায় এবং নিরাপত্তা ও অস্ত্র ক্রয়ের জন্য ক্ষমতাধর দেশের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়।

ভূরাজনৈতিক সুবিধা: উদ্দেশ্য হতে পারে মানুষ হত্যা বিশেষ করে নিরিহ মুসলমান হত্যা করা যেটি কয়েক দশক ধরে হয়ে আসছে। উদ্দেশ্য হতে পারে দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অথবা প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন তেল, গ্যাস, খনিজ) দখল করা। জনগণকে বিভক্ত করতে না পারলে এ কাজ করা কঠিন। জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করার মোক্ষম হাতিয়ার হলো ফলস এনিমি তৈরি করা।

মানবাধিকার লঙ্ঘন: এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নির্যাতন বা গণহত্যার মত ঘটনা ঘটতে পারে, যেমন হিটলারের শাসন বা ইরাক যুদ্ধ।

সমাজে বিভাজন তৈরি করা: ফলস এনিমি তৈরি করে সমাজে ভীতি এবং ঘৃণা ছড়ানো যায়, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস কমে যায় এবং জাতীয় ঐক্য নষ্ট হতে থাকে। এর ফলে যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থন বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষমতাধর গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে সক্ষম হয়।

আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়: যখন একটি দেশ অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে চায়, তখন সে ফলস এনিমি তৈরি করে এবং তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করে। যুদ্ধের বৈধতা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়।

অধিকৃত অঞ্চলের দখল: কোন অঞ্চল দখল করার জন্য যুদ্ধের প্রয়োজনে কৃত্তিমভাবে শত্রু তৈরি করা হয় যা ফলস এনিমি। এই শত্রু তৈরি করে জনগণের মধ্যে ঐক্য তৈরি করা হয়, যাতে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা জনগণ উপলব্ধি করে এবং সমর্থন করে।

আবার কোন অঞ্চল আক্রমণের সিন্ধান্ত হওয়ার পর অজুহাত তৈরির জন্য পরিকল্পিতভাবে কোন ঘটনা ঘটিয়ে সেই দেশকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে জনমত তৈরি করা হয়।

ফলস এনিমি এবং যুদ্ধ

যুদ্ধে ফলস এনিমি তৈরি এবং তাদেরকে ব্যবহারের নজির ইতিহাসে অনেক আছে। এ সময় দেশকে অস্থিতিশীল করে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে এটি অন্যতম একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য কখনও ধর্মীয়, অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার হতে পারে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে ভুল শত্রু তৈরি করা হয়।

ফলস এনিমি - মিথ্যা শত্রু বা কৃত্রিম শত্রু

উদাহরণস্বরূপ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কোন পরিকল্পিত নকশায় সাজানো, অর্থনৈতিক ও উপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জের ধরে হলেও জার্মানি এবং ব্রিটেনকে একে অপরের বর্বর শত্রু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যাতে যুদ্ধকে অনিবার্য হিসেবে গণ্য করা যায়, জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা যায় এবং জনগণের কাছে তা ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির শত্রু হিসেবে ইহুদিদের উপস্থাপন করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা এবং বিদ্বেষ ছড়িয়ে যুদ্ধকে অনিবার্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। যা পরবর্তীতে হলোকাস্ট–এর দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন এটি প্রতিষ্ঠিত ধারনা যে, এটি আসলে হিটলারের একটি কৌশলগত রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল। যার উদ্দেশ্য জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ইহুদি রিসেটেলমেন্টের মতো সুদূরপ্রসারি চিন্তা থেকে করা হয়েছিল। এ যুদ্ধেও ইহুদিরা এবং অন্যান্য গোষ্ঠীকে ফলস এনিমি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল, যাতে মূল সংঘর্ষের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য আড়ালে থাকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘কমিউনিজম’ এবং ‘কমিউনিস্ট চীনা শত্রু’ কে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালিয়েছিল। এটি ভিয়েতনামবাসীদের সত্যিকার মুক্তির প্রতিবন্ধকতা ছিল না, বরং পরিকল্পিতভাবে শত্রুপক্ষ তৈরি করে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছিল যার উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিজম বিরোধিতা এবং অধিকৃত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়া।

ইরাকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘ধ্বংসাত্মক অস্ত্র’ থাকার দাবি তুলে আগ্রাসন চালিয়েছিল। সাদ্দাম হুসেন এবং ইরাকের সরকারকে বিশ্বের জন্য বড় শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের কারণ নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসন এবং তেল। সাদ্দাম হোসেন ছিলেন ফলস এনিমি।

কল্পিত নতুন বিশ্ব গড়ার সবচেয়ে বড় স্পিরিচুয়াল বাধা হলো মুসলমান। আর এ কারণেই ১৯৯০ থেকে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে একই পক্ষের আক্রমণে একের পর এক মুসলিম দেশ আক্রান্ত হয় আর নানা অজুহাতে নিরিহ মুসলমানদের গণহত্যা, নির্যাতন করা হয়। এর পিছনে একটিই লক্ষ্য আর তা হলো স্পিরিচুয়াল বাধা দূর করা। এই বাধা দূর করতে যে কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে তা হলো কনট্রলড অপোজিশন এবং ফলস এনিমি। আশা করি এর গুরুত্ব এবং গভীরতা উপলব্ধি করতে আর সমস্যা হবে না। কারা কনট্রলড অপোজিশন এবং ফলস এনিমির ভূমিকায় আছে আশা করি তাও নিজেরাই খুজে বের করতে পারবেন। বাস্তবতা হলো, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মজলুম মুসলমানদের রক্ষার নাম করে যত সংগঠন লড়াই করছে তারা কোন না কোন ভাবে এই দুই কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। সবখানে অধস্তন পর্যায়ে নিবেদিতপ্রাণ কিছু যোদ্ধা আছে কিন্তু তারা নিয়ন্ত্রিত শেকলে বাঁধা। প্রসঙ্গত মুসলিম দেশের কাছে যে অস্ত্র আছে তাও নিয়ন্ত্রিত শেকলে বাঁধা এবং অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সেই অস্ত্র কেবলই আরেক মুসলিম দেশের উপর ব্যবহারের জন্য।

জেন-জি

উপরের দুই শক্তির বাহিরে বর্তমান ইউনিপোলার সিস্টেমের নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা মাঠ পর্যায়ের কর্মী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। সোশ্যাল মিডিয়া প্রোগ্রামিং দ্বারা তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ্যালগরিদম দ্বারা মাইন্ড কনট্রল করা হয়। কোন ইস্যু হঠাৎ ভাইরাল হয়, আবার কোনটা হারিয়ে যায়। ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’ -এর নামে অনেক সত্য প্রচার করা যায় না। এগুলো এমনি এমনি হয়না। বিশেষ করে প্রতিটি নির্বাচিত ইস্যু এআই এ্যালগরিদম দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। প্রয়োজনের স্বার্থে এ্যালগরিদমকে মানিপুলেট করে আন্দোলন-বিক্ষোভের গতি নির্ধারণ করা হয়। এআই, সফটওয়্যার, রোবট, বটের সাথে কাজ করে কিছু হিউম্যান এজেন্ট (কনট্রলড অপোজিশন, ফলস এনিমি)। এটি সম্পূর্ণ নতুন ধারার ওয়্যারফেয়ার। জেন-জি এই ওয়্যারফেয়ারের অনেক বড় শক্তি। হয়ত এদের একটি অংশ সত্য উপলব্ধি করতে পারবে এবং ফিরে আসবে। কিন্তু বিভ্রান্ত একটি প্রজন্মকে বর্তমান ইউনিপোলার সিস্টেম সফলভাবে ব্যবহার করতে পেরেছে। এই কৃতিত্ব তাদের দিতে হবে। জেন-জি এর আভিধানিক অর্থ নাকি ‘Generation Z’ থেকে আসছে। ১৯৯০ -এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত জন্ম নেওয়া প্রজন্ম। অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না যদি নিকট ভবিষ্যতে Generation Z এর অর্থ Generation of Zionism হিসেবে চিহ্নিত হয়।

ক্লাব অব রোমের ম্যাপ ও নতুন বিশ্ব

ক্লাব অব রোম ১৯৭৪ সালে The 10 Kingdoms Map নামে গবেষণা প্রতিবেদনে পৃথিবীকে মোট ১০টি বৃহৎ অঞ্চলে বা ম্যাপে ভাগ করার প্রস্তাব করেছিল। পরবর্তীতে এটি নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা তৈরি হলেও অনেক গ্রহণযোগ্য রেফারেন্সে এই মডেলের সত্যতা স্পষ্ট হয়। জানুয়ারী ২০২৫ সালের ResearchGate -এর একটি প্রকাশনায় এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। বলা হয় ক্লাব অফ রোম কোন রাজনৈতিক সংগঠন নয়, মানচিত্র বদলে দেয়ার মতো সামরিক বাহিনী নেই বরং এটি কেবল গবেষণামূলক অঞ্চলবিন্যাসের প্রস্তাবনা।

বৃহৎ শক্তির অঞ্চলভিত্তিক গ্রেটার মানচিত্র

গবেষণা অনুযায়ী ১০ অঞ্চলের মডেল মূলত পৃথিবীর অর্থনীতি, জনসংখ্যা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য, শিল্প, শক্তি ও পরিবেশগত গ্লোবাল মডেলিংয়ের সুবিধার জন্য তৈরি ‘Ten World Regions’ – যা পরে সাধারণভাবে ‘ক্লাব অব রোমের ১০ ম্যাপ’ নামে পরিচিতি পায়। তাদের মতে এটি কোন ভূরাজনৈতিক বিভাজন, সুপার-স্টেট গঠন বা বিশ্ব শাসনের পরিকল্পনা নয় বরং গ্লোবাল ট্রেন্ড বিশ্লেষণের জন্য একটি সরলীকৃত ‘রিজিওনাল মডেল’।

এই ১০টি অঞ্চল হলো –

১. উত্তর আমেরিকা
– যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো
– উচ্চ শিল্পায়ন, শক্তিশালী অর্থনীতি, উচ্চ সম্পদ-ব্যয়কারী অঞ্চল

২. পশ্চিম ইউরোপ
– ইউরোপীয় ইউনিয়নের পশ্চিম অংশ, যুক্তরাজ্য, স্ক্যান্ডিনেভিয়া
– প্রাচীন শিল্পায়িত, পরিবেশ ও সম্পদ নীতিতে উন্নত

৩. জাপান
– প্রযুক্তি-নির্ভর, উচ্চ ঘনত্বের শিল্পায়ন
– পৃথক করা হয় কারণ এর অর্থনৈতিক আচরণ পশ্চিম ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়া থেকে আলাদা

৪. অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড
– কম জনসংখ্যার, উচ্চ সম্পদযুক্ত, উন্নত রাষ্ট্রসমূহ
– খাদ্য রপ্তানিতে সক্ষম অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত

৫. পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়া
– প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ
– ঐতিহাসিকভাবে ভারী শিল্প নির্ভর; বৃহৎ স্থলভাগ ও সম্পদ

৬. ল্যাটিন আমেরিকা
– দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা
– কৃষি, বন, খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ। অসম অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ।

৭. উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য
– আরব উপদ্বীপ, ইরান, উত্তর আফ্রিকা
– জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি, মরুভূমি, পানি সংকটাপন্ন অঞ্চল

৮. সাব-সাহারান আফ্রিকা
– সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের আফ্রিকা
– কম শিল্পায়ন, উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধি যা পরিবেশগত মডেলিংয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

৯. দক্ষিণ এশিয়া (ভারত উপমহাদেশ)
– ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা
– অত্যন্ত উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্ব। খাদ্য ও সম্পদের দিক থেকে সংবেদনশীল অঞ্চল।

১০. পূর্ব এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া
– চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ইত্যাদি
– দ্রুত শিল্পায়ন ও উন্নয়ন কেন্দ্র। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উত্থান গ্লোবাল মডেলে বড় প্রভাব ফেলে।

গবেষণা অনুযায়ী দুইশ’র বেশি দেশ নিয়ে মডেল করা হলে গণনা অসম্ভব জটিল হয়ে যাবে। তাই গ্লোবাল মডেলকে সরলীকরণ করার জন্য এই প্রস্তাবনা। এছাড়া পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া, সাব-সাহারা আফ্রিকার আচরণ এক নয়। জনসংখ্যা, শিল্প, পানির ব্যবহার, খাদ্য উৎপাদন সব ভিন্ন।

ম্যাপ মডেল ও কন্সপাইরেসি থিউরি

দশ ম্যাপের এই মডেলকে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ‘বিশ্বকে ১০টি নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনা’ এবং এনডব্লিউও (New World Order) এর নকশা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। তাদের মতে বড় যুদ্ধের পর যেভাবে ম্যাপের পরিবর্তন করা হয়, তেমনি আরো একটি বড় যুদ্ধ ও কৃত্তিম প্রাকৃতিক বিপর্যয় তৈরি করে এই ম্যাপ বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা আছে। এক নজরে এই মডেলকে ঘিরে কন্সপাইরেসি থিউরিগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. বিশ্বে নতুন ১০টি সুপারস্টেট তৈরি করার নকশা। নুতন বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যে শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ সহজ করার জন্য এই নতুন বিভাজন। পৃথিবীকে ১০টি যুক্ত রাষ্ট্র বা ১০টি নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলে ভাগ করে একটি বিশ্ব সরকার (গ্লোবাল গর্ভন্যান্স) গঠন করার পরিকল্পনা যা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার অন্যতম পিলার ওয়ান ওয়ার্ল্ড গর্ভন্যান্সকে বুঝায়।

২. দশ ম্যাপ বাইবেলের ‘Ten Kingdoms’ ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে সম্পর্কিত। ব্রিকসের দশ রাজা ও বিবলিক্যাল প্রফেসি সম্পর্কে আগে উল্লেখ করেছি। এটি ব্রিকসের ১০ রাজা নাকি ক্লাব অফ রোমের ১০ রাজা? নাকি অন্য কোন রহস্য লুকিয়ে আছে? তবে এখন পর্যন্ত দশটি অঞ্চলকে বাইবেলের ‘শেষ জামানার দশ রাজা’ হিসেবেই আলোচনায় বেশি পাওয়া যায়। বিবলিক্যাল প্রফেসি অনুযায়ী ১০ রাজা অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতা অর্জন করবে এবং এরপরই হঠাৎ ভয়াবহ ধ্বংসের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। বিবলিক্যাল প্রফেসি অনুসরণ করে মডেল ডিজাইন করা হলে ঘটনাচক্রের পরবর্তী পর্বও বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। এটি হাদিসের কয়েকটি রেফারেন্স দ্বারাও প্রমাণিত যা মালহামা নিয়ে লেখায় উল্লেখ আছে। ধর্মীয় এই রেফারেন্সগুলোকেই ম্যাপ মডেল নিয়ে সংশয়ের মূল ভিত্তি বলা যায়।

৩. পরিবেশ রক্ষার অজুহাতে জনসংখ্যা কমানোর গোপন পরিকল্পনা। কন্সপাইরেসি থিউরিস্টদের মতে এটি বিশ্ব জনসংখ্যা হ্রাস করার একটি নীলনকশা।

৪. বিশ্বের সম্পদ দখলের নীলনকশা। তাদের মতে কোন অঞ্চলের সম্পদ (জ্বালানি, খনিজ, খাদ্য) কে কে নিয়ন্ত্রণ করবে তা নির্ধারণের মানচিত্র।

৫. গুপ্ত সংগঠনগুলোর (সেকরেট সোসাইটি) পরিকল্পিত নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা (NWO – New World Order) বাস্তবায়নের অংশ।

৬. ক্লাব অফ রোম যে ‘উচ্চ ঝুঁকির অঞ্চল’ নির্ধারণ করেছিল – যুদ্ধও এখন সেইসব অঞ্চলে বেশি হচ্ছে। দশটি অঞ্চলের মধ্যে ৩টি অঞ্চলকে The Limits to Growth -এর প্রতিবেদনে ‘বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলা হয়েছিল:

  • মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা
  • সাব সাহারান আফ্রিকা
  • পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়া

কিন্তু এর বাহিরেও সম্প্রতি উচ্চ ঝুঁকির অঞ্চলের মধ্যে এশিয়া অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। বড় সংঘাতগুলো মূলত নিচের কয়েকটি অঞ্চলে হচ্ছে:

• পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়া রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ
• মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা গাজা, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন
• সাব-সাহারান আফ্রিকা সুদান, সাহেল অঞ্চল, কঙ্গো
• পূর্ব এশিয়া চীন–তাইওয়ান উত্তেজনা
• দক্ষিণ এশিয়া ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মায়ানমার, বাংলাদেশে উত্তেজনা, যুদ্ধ।
• পূর্ব এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়া দক্ষিণ চীন সাগর উত্তেজনা
• ল্যাটিন আমেরিকা আমেরিকা-ভেনিজুয়েলা উত্তেজনা

উপরের এই অঞ্চলগুলোতে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর উত্তেজনা বেড়েছে আর কমেনি এবং পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অনেক দ্রুত, অপ্রত্যাশিত গতিতে বদলে যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখানো হয়, ভৌগোলিক–অর্থনৈতিক চাপ যেখানে বেশি, সেখানে সংঘাতও বেশি। যেসব অঞ্চলে সম্পদ সংকট, জনসংখ্যা চাপ ও রাজনৈতিক দুর্বলতা একসাথে বাড়বে, সেখানে সংঘাত বাড়বে। গবেষণার এতো বছর পর এর বাস্তবচিত্র দেখা যাচ্ছে। বলা হয়, ‘এক অঞ্চলের সমস্যা অন্য অঞ্চলে সিস্টেমিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।’ এখন দেখা যাচ্ছে, চলমান যুদ্ধগুলো ১০টি অঞ্চলের সিস্টেমকে সরাসরি প্রভাবিত করছে:

• ইউক্রেন যুদ্ধ → ইউরোপে জ্বালানি সংকট → খাদ্যের দাম বাড়া → সারা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি
• গাজা/মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত → তেলের বাজার অস্থির → বৈশ্বিক পরিবহন সংকট
• আফ্রিকার সংঘাত → শরণার্থী প্রবাহ → ইউরোপে সামাজিক চাপ
• তাইওয়ান উত্তেজনা → বিশ্বব্যাপী চিপ মার্কেটে ঝুঁকি

ক্লাব অফ রোমের প্রস্তাবনার পিছনে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ানোর কারণ চিহ্নিত করে এক শ্রেণী উল্লেখ করেন:

• মানচিত্রগুলো বড় অঞ্চল ধরে আঁকা, তাই ‘বিশ্বকে ১০ ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা’ মনে হতে পারে।
• অনেক যুদ্ধ সেই অঞ্চলগুলোতেই হচ্ছে, তাই কেউ কেউ মনে করে ‘ম্যাপ অনুযায়ী যুদ্ধ হচ্ছে’।
• তাদের মতে এটি সিস্টেমিক মিল, পরিকল্পিত সংযোগ নয়।
• ক্লাব অফ রোম কোনো যুদ্ধ তৈরি বা নির্দেশ করে না, কিন্তু যুদ্ধের আলামতগুলো কোথায় ঘনীভূত হচ্ছে – তার বিশ্লেষণ কাঠামো ঠিকমতো ধরেছিল।

গ্রেটার ইসরায়েল, গ্রেটার মিজোরাম, অখন্ড ভারত – কথাগুলো কি পরিচিত মনে হচ্ছে? রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কেবল ঐ ভূখন্ডে সীমাবদ্ধ নেই বরং পুরো ইউরোপে উত্তেজনা ছড়িয়েছে যা চূড়ান্ত পর্যায়ে ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। অখন্ড ভারতের নামে এই উপমহাদেশের মানচিত্র বদলে দেয়ার নকশা মিডিয়ায় ইতিমধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে। মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লালদুহোমা গত ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে একটি সভায় নিজেদের বিভাজিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সীমানা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপর গ্রেটার মিজোরামের বিষয় আলোচনায় আসে।

আমেরিকা ও কানাডা একত্রিত করে মানচিত্র
সোশ্যাল ট্রুথের অফিসিয়াল পেজে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মানচিত্র প্রকাশ।

কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার মধ্যেই দেশটিকে একত্রিত করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৭ জানুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সোশ্যাল ট্রুথে কানাডাকে যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মানচিত্রের ছবি দিয়ে ক্যাপশনে ট্রাম্প লিখেন – ওহ কানাডা!

এরআগে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে এক আলোচনায় কানাডা প্রসঙ্গে বলেছিলেন ‘আপনি কৃত্রিম সীমান্ত থেকে মুক্তি নিন। এরপর দেখুন বিষয়টি দেখতে কেমন লাগে। বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অনেক ভালো হবে।’ ট্রাম্প বলেন, ‘কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এক হবে। তাদের সেনাবাহিনী খুবই ছোট। তারা আমাদের সেনাদের ওপর নির্ভরশীল। সব ঠিক আছে। কিন্তু আপনারা জানেন, তাদের এজন্য অর্থ দিতে হয়। এটি খুবই অযৌক্তিক।’

আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকাও বাদ যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যে বহুমাত্রিক সংঘর্ষের জের ধরে মানচিত্র বদলে দেয়ার আয়োজন চলছে যেখানে গ্রেটার ইসরায়েলের মানচিত্র ইতিমধ্যে জাতিসংঘ সভায় দেখানো হয়। এই গ্রেটার ইসরায়েল মানচিত্রকেও কন্সপাইরেসি থিউরি বলা হতো। এখন এটি বাস্তবতা। আমার মতামত বরাবর একই – কন্সপাইরেসি থিউরি বলে যা প্রচার হয় তা এমন এক ধরনের দ্বৈত দৃশ্যপট যেখানে ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার গোলকধাঁধা তৈরি করে লক্ষ্য অর্জন করা হয়। সেই পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো যা পুরোটাই ধোঁকা কিন্তু তা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ তর্কের সুযোগ থেকে যায়।

কন্সপাইরেসি থিউরিস্টদের দাবির যৌক্তিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু তা ৫০ বছর আগে কেউ হয়তো কল্পনাও করতে পারতো না। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ, যুদ্ধ, সংঘাত দেখে প্রশ্নগুলো আবার বারবার আলোচনায় আসছে। বড় রকমের কৃত্তিম দুর্যোগ (ওয়েদার মডিফিকেশন প্রোগ্রাম) এবং যুদ্ধ ছাড়া মানচিত্র বদলানো সম্ভব নয় তা যে কেউ অনুমান করতে পারে। তাদের গবেষণা প্রস্তাবনা যদি অন্য একাধিক পক্ষের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হয় তবে কন্সপাইরেসি থিউরিস্টদের সংশয় সত্য প্রমাণিত হবে।

দশ অঞ্চলের মডেল এখনকার গ্লোবাল পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য এক ধরনের ‘ব্যাকগ্রাউন্ড কাঠামো’ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে সবকিছু একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যেটা এককভাবে কোন সংগঠন নয় বরং সমন্বিত প্রচেষ্টা। প্রতিটি অঞ্চলভিত্তিক সংঘাতকে একক কোন সংস্থা নয় বরং পুরো ইউনিপোলার সিস্টেম সমন্বিতভাবে প্রভাবিত করছে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য।

ইউনিপোলার বনাম মাল্টিপোলার বিশ্ব

রোম, পারস্য, অটোম্যান সাম্রাজ্যের মতো ইতিহাসের একটা লম্বা সময় ধরে বহুমাত্রিক (মাল্টিপোলার) শাসন ব্যবস্থায় বিশ্ব পরিচালিত হয়ে আসছে। সেখান থেকে দুই পরাশক্তি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকার দ্বারা বাইপোলার বা দ্বিমাত্রিক শাসন শুরু হয়। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে এককভাবে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে ইউনিপোলার বিশ্ব গড়ে ওঠে।

বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন – যে নতুন বিশ্বের মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে সেটি কি ইউনিপোলার, বাইপোলার নাকি মাল্টিপোলার হতে যাচ্ছে? মূল পরিকল্পনাকারীরা শতভাগ আত্মবিশ্বাসের সহিত যা লালন করে তা অবশ্যই নতুন ইউনিপোলার সিস্টেম। জেরুজালেমকেন্দ্রিক এক বিশ্ব, এক রাজা, এক গর্ভন্যান্স ইত্যাদি। তবে যে সিস্টেমেই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠুক না কেনো মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এটা নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া যায়।

একদিকে যেমন নতুন ইউপোলার সিস্টেমের প্রস্তুতি তেমনি মাল্টিপোলার নতুন বিশ্বের সম্ভাবনাও এখন গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একক মেরুকেন্দ্রিক ইউনিপোলার ব্যবস্থা আলগা হতে থাকে এবং মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয় যার কারণ:

➥ চীনের দ্রুত উত্থান। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) -এর মাধ্যমে একশ’র বেশি দেশে প্রভাব বিস্তার।

➥ রাশিয়ার পুনরুত্থান। পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান। সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক পুনরুত্থান এবং সক্ষমতা প্রমাণ। ইউরেশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় কৌশলগত সক্রিয় অবস্থান।

➥ ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান। একাধারে পশ্চিমা জোট এবং রাশিয়ার সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে যা মাল্টিপোলার বিশ্বের একটি বৈশিষ্ট্য।

➥ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমন্বিত ভূমিকা

➥ চীন–রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা, SCO, BRICS সম্প্রসারণ যা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন শক্তির জন্ম দিয়েছে।

➥ উন্নয়নশীল দেশ তথা গ্লোবাল সাউথ -এর প্রভাব বৃদ্ধি (BRICS, ASEAN ইত্যাদি)

➥ মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকায় একদিকে সংঘাত আবার একইসাথে নতুন আঞ্চলিক শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা উকি দিচ্ছে।

➥ জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ – এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন শক্তির বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিতে চাপ বাড়ছে।

➥ নতুন অর্থনৈতিক ব্যাংক, নতুন বাণিজ্য রুট তৈরির পাশাপাশি ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর অব্যাহত প্রচেষ্টা।

➥ একদিকে সম্পদের আধার আফ্রিকায় পশ্চিমা প্রভাব কমছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।

এসব মিলেই আন্তর্জাতিক শক্তি বণ্টন বহুমুখী হয়ে উঠছে – যা নতুন মাল্টিপোলার সিস্টেম উত্থানের সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করে। ফলাফল হলা একটি মাল্টিপোলার নতুন বিশ্ব যেখানে:

✔ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া তিনটি বড় পোল
✔ ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ব্রাজিল, সৌদি আরব, ইরান আঞ্চলিক পোল

মাল্টিপোলার বিশ্ব এবং রাশিয়া-চীন

বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শীতল যুদ্ধ–পরবর্তী ইউনিপোলার যুক্তরাষ্ট্র–নির্ভর ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিভিন্ন শক্তির উত্থানের ফলে বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামো দ্রুত মাল্টিপোলার সিস্টেমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় একদিকে রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মেরু হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে। অপরদিকে পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো চীনের বাণিজ্যিক উত্থান।

এক নজরে চীন-রাশিয়ার উত্থান এবং নতুন মাল্টিপোলার বিশ্বে ভূমিকা:

পূর্ব ইউরোপ, আর্কটিক, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক–রাজনৈতিক উপস্থিতির মাধ্যমে রাশিয়া ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব রেখে যাচ্ছে। এই পুনরুত্থান ইউরেশিয়ান শক্তির কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। তারা ইউক্রেন যুদ্ধে প্রমাণ করে যে সব শক্তি এক হয়েও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এককভাবে আর পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রায় ৩০ হাজার পশ্চিমা স্যাংশনের পর রাশিয়া এখন এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকার দিকে ঝুঁকেছে যা মাল্টিপোলার বিশ্বকে আরও দৃঢ় করছে। বলা যায় আন্তর্জাতিক রাজনীতি একক আধিপত্য থেকে সরে গিয়ে এমন এক বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রবেশ করছে, যেখানে রাশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী এবং প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

অন্যদিকে মাল্টিপোলার বিশ্বে চীন শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; একটি শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কূটনীতি ও নিরাপত্তা – সব ক্ষেত্রেই চীন প্রভাব বিস্তার করে এক নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করছে, যা ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক রাজনীতির কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। গত চার দশকে চীনের অভূতপূর্ব জিডিপি প্রবৃদ্ধি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। দ্রুতগতিতে নৌ, বিমান ও সাইবার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালী এবং মহাকাশ/সাইবার স্পেসে তাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, 5G, ই–কমার্স, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌর প্রযুক্তিতে চীন বৈশ্বিক নেতৃত্বের দিকে এগোচ্ছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)–এর মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপে অবকাঠামো অর্থায়ন করছে। প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি – সব ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র।

রাশিয়া–চীন কৌশলগত সহযোগিতা BRICS, SCO (Shanghai Cooperation Organization) এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নতুন এক ‘অ-পশ্চিমা মেরু’ গঠন করছে। AIIB, NDB (BRICS Bank) -এর মতো বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন IMF–World Bank–এর পরিপূরক বা প্রতিদ্বন্দ্বী। উভয় দেশ মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে যৌথ অবস্থান নিয়ে মাল্টিপোলারিটির ভিত্তি শক্ত করছে।

গ্লোবাল সাউথ এবং নতুন বিশ্ব

সাধারণত অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল, উদীয়মান রাজনীতি এবং ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশবাদ বা কাঠামোগত বৈষম্যের স্বীকার দেশসমূহ গ্লোবাল সাউথ (Global South) ধারনার অন্তর্ভুক্ত। এটি কেবল ভৌগোলিক নয়; বরং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত একটি বৈশ্বিক শ্রেণিবিভাগ। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় অবহেলিত এসব দেশগুলো ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গ্লোবাল সাউথের অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহ

  • দক্ষিণ এশিয়া (ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল)
  • দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ইত্যাদি)
  • আফ্রিকার প্রায় পুরো অঞ্চল
  • ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহ
  • মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (MENA) অনেক দেশ
  • ওশেনিয়ার কিছু উন্নয়নশীল রাষ্ট্র

এগুলো সাধারণত ‘গ্লোবাল নর্থ’ -এর বিপরীতে অবস্থিত। নতুন বিশ্ব কাঠামোয় চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি দেশ গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দিচ্ছে। গ্লোবাল সাউথের উত্থানের কারণসমূহ:

➥ বিশ্বের বৃহৎ জনসংখ্যা গ্লোবাল সাউথে অবস্থিত – যা বিশাল শ্রমবাজার, উৎপাদনশীলতা এবং ভোক্তা বাজার তৈরি করছে।

➥ বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইতিমধ্যে গ্লোবাল সাউথে চলে গেছে। দক্ষিণ–দক্ষিণ বাণিজ্য (South–South Trade) ক্রমাগত বাড়ছে।

➥ আফ্রিকার একাধিক দেশে নিরাপত্তা সহায়তা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও সম্পদ–ভিত্তিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।

➥ মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকায় কূটনৈতিক, সামরিক ও জ্বালানি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প তৈরি হচ্ছে।

➥ BRICS, SCO, African Union, ASEAN ইত্যাদি জোটগুলো গ্লোবাল সাউথের রাজনৈতিক শক্তিকে একীভূত করছে।

➥ তরুণ প্রজন্মের প্রাচুর্য (Demographic Dividend) ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে গ্লোবাল সাউথকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করছে।

➥ আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ায় বিনিয়োগ, ঋণ, অবকাঠামো, জ্বালানী, সামরিক ইত্যাদি খাতে চীন-রাশিয়ার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে যা পশ্চিমা জোটের একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে।

শান্তি/নিরাপত্তা চুক্তি ও নতুন বিশ্ব

উপরের ধারাবাহিকতায় তথ্য বিশ্লেষণ করতে থাকলে কখনও ইউনিপোলার কখনও মাল্টিপোলার নতুন বিশ্বের সম্ভাবনার ধাঁধার জট পাকতে থাকবে। এখান থেকে কখনও সমীকরণ মিলানো সম্ভব না। কারণ বর্তমান ইউনিপোলার নেতৃত্ব যুদ্ধ চায়। একটি গ্রেট রিসেটের মধ্য দিয়ে মানচিত্র পরিবর্তন করে নতুন ইউনিপোলার সিস্টেমকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়। তারা কখনও আপোসে উদীয়মান মাল্টিপোলার সিস্টেমের কাছে বিশ্ব মোড়লের দায়িত্ব ভাগাভাগি হতে দিবে না। অতএব যুদ্ধ অনিবার্য। কিন্তু এতকিছুর পরও কি লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে? তারা অত্যন্ত সুসংহত এবং ঐক্যবদ্ধ। কিছু লোক দেখানো বিরোধিতা বা মতবিরোধ থাকলেও পুরো পশ্চিমা শক্তি একজোট এবং অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য।

অপরদিকে পশ্চিমা বিরোধী শক্তিগুলো ভিন্ন ভিন্ন দর্শন ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। যেমন রাশিয়া চায় অর্থোডক্স বলয়ের নতুন বিশ্ব। চীন বাণিজ্যিক নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে আধিপত্য বাড়াতে চায়। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্ব বাড়াতে চায়। এরা সবাই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত। এই বিবেচনায় সবাই একত্রিত হলেও প্রত্যেকের চূড়ান্ত গন্তব্য আলাদা। তাছাড়া নিজেদের দুর্বলতা থাকায় বর্তমান ইউনিপোলার সিস্টেম এদের ব্যবহার করছে তাদের নতুন ইউনিপোলার সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এক্ষেত্রে চীনকে মাল্টিপোলার নতুন বিশ্বের অগ্রদূত ভাবা হলেও আগ্রাসী বাণিজ্যনীতির কারণে নতুন ইউনিপোলার সিস্টেম প্রতিষ্ঠার সহযোগী ভূমিকায় রূপ নিবে যার আলামত করোনা মহামারির সময় দেখা গিয়েছে, সোশ্যাল ক্রেডিটসহ অন্যান্য পশ্চিমা এনডব্লিউও এজেন্ডাতে চীনের জোড়ালো ভূমিকা আছে। বর্তমান ইউনিপোলার সিস্টেমের সাথে তাদের বাণিজ্যিক লড়াই থাকলেও আদর্শিক মিল আছে। বাণিজ্যিক প্রতিযোগীতাকে চলমান রেখেই তারা চীনকেও ব্যবহার করবে নতুন ইউনিপোলার সিস্টেম প্রতিষ্ঠার জন্য। তাছাড়া এস্কেটোলজিক্যাল বিশ্লেষণে চীনের অবস্থান আর রাশিয়ার অবস্থান এক নয়। যদিও নিষেধাজ্ঞা কমাতে রাশিয়াও শুরুতে নমনীয় ভূমিকায় থাকবে। বাণিজ্যিক সুবিধা, কূটনৈতিক চাপ, সামরিক হস্তক্ষেপ – যে দেশকে যেভাবে দরকার সামাল দেয়া হচ্ছে। একের পর এক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও শান্তি চুক্তি হচ্ছে যেগুলোর ধরন এবং উদ্দেশ্য প্রায় অভিন্ন। বিবলিক্যাল প্রফেসি অনুসরণ করে চুক্তিগুলো হয়ে থাকলে আমরা এই মূহুর্তে ‘মিথ্যা শান্তি চুক্তির’ (Fake Peace Deal) সময় অতিবাহিত করছি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা গ্রহণের পর উল্লেখযোগ্য চুক্তির তালিকা:

চুক্তিতারিখসংক্ষিপ্ত বর্ণনা
2025 United States–Houthi Ceasefire  ৬ মে ২০২৫ইয়েমেনে যুদ্ধবিরতি; যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী (হুথি) — বাণিজ্য নৌপথ ও রেড সি অঞ্চলে হামলা বন্ধের বিনিময়ে — যুক্তরাষ্ট্র তার বিমান ও সামরিক হামলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
US–Saudi Arabia 2025 Arms Deal  ১৩ মে ২০২৫প্রায় $১৪২ বিলিয়নের অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সামগ্রী চুক্তি, যা যুক্তরাষ্ট্র বলেছে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড়” প্রতিরক্ষা চুক্তি।
US–UAE $200 Billion Commercial & Investment Deals  ১৫ মে ২০২৫ট্রাম্পের গালফ পরিদর্শনের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউএই এককভাবে প্রায় $২০০ বিলিয়ন মূল্যের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি ঘোষণা করে।
Democratic Republic of the Congo–Rwanda Peace Agreement  ২৭ জুন ২০২৫কংগো ও রুয়ান্ডার মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর। এতে রুয়ান্ডা সেনা পূর্ব কংগো থেকে প্রত্যাহার করবে এবং কংগো সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহীদের (যেমন FDLR) বিরুদ্ধে সমন্বয় হবে।
Armenia–Azerbaijan 2025 Peace Agreement  ৮ আগস্ট ২০২৫সাউথ ককেশাস অঞ্চলে, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব শেষ করার জন্য, ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি স্বাক্ষর। এই চুক্তি কেবল শান্তি নয় — অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং যোগাযোগ (transport corridor) সম্পর্কেও বিনিময় চুক্তি।
Gaza Peace Plan 2025২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, জিম্মি মুক্তি, হামাসের অস্ত্র ত্যাগ, গাজার প্রশাসন ও পুনর্গঠনসহ শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা। একে ২০-দফার রোডম্যাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
Kuala Lumpur Peace Accord (Thailand–Cambodia Ceasefire)২৬ অক্টোবর ২০২৫সিডনিতে (কুয়ালালামপুর অ্যাসিয়ান সামিটের পাশে) থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া — সীমান্ত যুদ্ধ বন্ধ ও স্থায়ী শান্তির পুরাতন দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য চুক্তি।
C5+1 Deal Zone (USA + Central Asia Commercial Agreements)  ৬ নভেম্বর ২০২৫যুক্তরাষ্ট্র ও ৫ মধ্য এশীয় দেশ (Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, Turkmenistan, Uzbekistan) এর সঙ্গে ২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বাণিজ্য/বিনিয়োগ চুক্তি ঘোষণা।=]

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সৌদি আরবের সাথে ১৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি এবং সবশেষ গাজা শান্তি চুক্তি। উল্লেখযোগ্য চুক্তিগুলো হয় মুসলিম এবং যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশের সাথে। উদ্দেশ্য নিরাপত্তা ও শান্তি ফিরিয়ে আনা। কিন্তু আব্রাহামিক চুক্তির সাথে কি এগুলোর কোন ব্যাকগ্রাউন্ড কানেকশন আছে? ইসরায়েল নর্মালাইজেশনের সাথে কোন সম্পর্ক আছে?

কেনো সাজানো চুক্তির আগে শান্তি শব্দ যোগ করলেই আমরা বিজয়োল্লাস করি তা বোধাগোম্য না। চক্রান্তের আড়ালেই আল্লাহর পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু চক্রান্তকে বিজয় বলে শয়তানের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয়া ছাড়া আর কিবা হয়! প্রশ্ন হতে পারে বিকল্প কি আছে? বিকল্প না থাকলে সবর করতে হবে। বিকল্প নেই জন্য নিরবে বিকল্প অনুসন্ধান না করে বিভ্রান্তির স্রোতে গা ভাসিয়ে বিজয়োল্লাস করার মানে নিজেদের অজ্ঞতাকে বুঝায়। ফিলিস্তিনে ৮০ শতাংশ ভূমি দখল, ৯০ শতাংশের বেশি ভবন গুড়িয়ে গণহত্যা চালিয়ে তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ইতিমধ্যে অর্জিত হয়ে গেছে। এখন পরবর্তী ধাপের কাজ শুরুর পালা। চুক্তিতে শান্তি শব্দ জুড়ে দিলেই সেখানে শান্তি ফিরে আসবে না। যা কিছু হচ্ছে তা নিজেদের স্বার্থে, তাদের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বার্থে হচ্ছে।  

প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির ২০টি পয়েন্টের ব্যাখ্যা খুজলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী এখন মেগা সিটি হবে যার নাম দেয়া হয়েছে ‘দ্যা গ্রেট ট্রাস্ট’। ইলন মাস্কের টেসলা ফ্যাক্টরি হবে, বড় বড় বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান হবে ইত্যাদি। আব্রাহামিক সমন্বিত ধর্মীয় উপাসনালয় (আগের লেখায় বিস্তারিত) হবে। সৌদির পরিকল্পিত নিয়ম (NEOM) সিটি বা তার চেয়েও অত্যাধুনিক সিটির নকশা পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায়। এই লিংকে ক্লিক করে বিস্তারিত পাবেন। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে যতগুলো চুক্তি হয়েছে তা এই মেগা প্রকল্প নির্বিগ্নে বাস্তবায়নের সাথে কোন না কোনভাবে জড়িত এমনটাই মনে করা হয়। বিভিন্ন দেশে শান্তি চুক্তি, নিরাপত্তা চুক্তি, পরমাণু চুক্তি, বাণিজ্য চুক্তি এই সব চুক্তির লক্ষ্য – ফিলিস্তিনে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এবং একই সাথে কল্পিত প্রকল্প ঘিরে ওয়ার্ল্ড অর্ডার পরিবর্তন করার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। নিজেকে প্রশ্ন করুন – দুনিয়ায় এতো জায়গা থাকতে ফিলিস্তিনে কেনো দ্যা গ্রেট ট্রাস্টের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে? কারণ থার্ড টেম্পল তৈরি হবে। থার্ড টেম্পল নিউ ইয়র্ক সিটিতে করলে হবে না। আল আকসা প্রাঙ্গনেই হতে হবে। দ্যা গ্রেট ট্রাস্ট হলো থার্ড টেম্পলের সহায়ক অবকাঠামো। কোন দেশকে সামরিকভাবে মোবাবিলা করা হচ্ছে, কাউকে স্যাংশন দিয়ে, কোথাও সংঘাতকে উস্কে দিয়ে, কোথাও ওয়েদার মডিফিকেশন প্রোগ্রাম, কোন দেশকে বিভিন্ন সহায়তা চুক্তির বিনিময়ে প্রকল্প নর্মালাইজেশনের কাজ করা হচ্ছে। এবং এ কাজে তারা শতভাগ সফল।

আরো কিছু চুক্তি বাকি আছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাশিয়ার সাথে শান্তি চুক্তি এবং সৌদি আরবের সাথে আর্বাহামিক চুক্তি। এই লেখা চলাকালীন সময় পর্যন্ত রাশিয়ার সাথে দফায় দফায় চুক্তি হওয়া নিয়ে সিন্ধান্ত রদবদল হচ্ছে। চুক্তিটি মস্কো বা রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হলে আমার কাছে এর একটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। এখানে এ্যান্টিক্রাইস্ট আড়ালে উপস্থিত থাকবে যার হাত ধরে চুক্তির অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং সফল হবে।

সৌদি আরবের সাথে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির পর এটিকেই ভিন্ন নামের আড়ালে আব্রাহামিক চুক্তি মনে হয়েছিল। কিন্তু গত ১৮ নভেম্বর ট্রাম্পের সাথে বৈঠকে সৌদি আরবের যুবরাজ বলেছেন, ‘আমরা আব্রাহাম চুক্তির একটি অংশ হতে চাই।’ এটি থেকে স্পষ্ট যে সরাসরি আব্রাহাম চুক্তি নামেই আরো একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। আগের চুক্তিটি মূল চুক্তির ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি সম্পর্কে আগের লেখায় বিস্তারিত ‍উল্লেখ আছে।

আগেও উল্লেখ করেছি, কুশীলবদের বড় বড় মৌলিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ধর্মগ্রন্থ থেকে – বাইবেল, তাওরাত ইত্যাদি। অক্ষর, প্রতীক ও সংখ্যার গভীর জ্ঞান দিয়ে মিলানো কাব্বালাহ বিদ্যা অনুসরন করে সিন্ধান্ত নেয়া হয়। কথিত শান্তি চুক্তিগুলো বিবলিক্যাল প্রফেসি অনুসরণ করে করা হলে ধরে নেয়া যায় সৌদি আরবের সাথে আব্রাহাম চুক্তির মেয়াদের কিছু সময় পর বা মাঝামাঝি সময়ের দিকে ‘সাডেন ডেস্ট্রাকশন’ পর্ব আছে।

পবিত্র কোরআন ও হাদিস থেকেও এ বিষয়ে আলামত পাওয়া যায়। মালহামা বিষয়ক লেখায় যে তিনটি পর্বের হাদিসের কথা উল্লেখ করি তার মধ্যে তৃতীয় পর্ব হতে পারে এই সাডেন ডেস্ট্রাকশন। এরই আলোকে উল্লেখ করি যে এই ফিতনা প্রথম কোন মুসলিম জনগোষ্ঠির উপরই আসবে। কালো ধোয়ার এই পর্বের মধ্য দিয়েই বিশেষ করে মুসলিম উম্মতের উপর এ যাবৎ আসা যত ফিতনা আছে তারমধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ফিতনার পর্ব শুরু হবে। এই ফিতনা কতদিন চলবে এমন কিছু সরাসরি উল্লেখ না পেলেও যেহেতু সাডেন ডেস্ট্রাকশন (পরমাণু আক্রমণকে ইঙ্গিত করে) তাই খুব বেশি সময় নিয়ে হবে এমনটা নয়। মূহুর্তের মধ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় হয়ে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাবে। এবং এটিই যদি তৃতীয় পর্বের চূড়ান্ত ফিতনা হয় তবে হয়ত আল্লাহর দেয়া প্রতিশ্রুতি যা সূরা বণি ঈসরাইলে উল্লেখ আছে তার বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ। আর এ কারণেই আমি বারবার উল্লেখ করে আসছি যে তৃতীয় পর্বের ফিতনার পর তাদের মহাপরিকল্পনাগুলো ভেস্তে যাওয়া শুরু হবে।

নতুন বিশ্বের সামরিক ও স্পিরিচুয়াল শত্রু

১৯৯০ সাল আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জন্য বারবার উল্লেখ করি। এই সময়ের আগে দুটি টার্গেটের একটি সম্পন্ন হয় এবং ঠিক তার পরপর আরেকটি অপারেশন শুরু হয়। ৯০ এর আগেই রাশিয়া ভেঙ্গে দুর্বল করা হয়। ঠিক তার পরের টার্গেটে পরিণত হয় মুসলমানরা। এটি এখনও চলমান আছে। এখন যাদের টার্গেট করা হচ্ছে তাদের একটা তালিকা করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে। তালিকায় রাশিয়া এবং তাদের মিত্র এবং মুসলমানদের পাবেন। পাকিস্তানের ইমরান খান অথবা ভেনিজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো, বেলারুশের আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, ইরান অথবা উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি। আর মুসলিম দেশের তালিকা নিশ্চয় সবার জানা। এটি কাকতালীয় ঘটনা নয়। মোটাদাগে দুই ধরনের শত্রুকে ক্রমাগত দুর্বল করা হচ্ছে। খেয়াল করুন – এই দুটি টার্গেট একই পক্ষ দ্বারা পরিচালিত। কারণ এ্যাস্কেটোলজিক্যাল বিশ্লেষণ অনুযায়ী কল্পিত নতুন বিশ্বের চিহ্নিত দুই শত্রু:

➥ সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হলো রাশিয়া (অর্থোডক্স খ্রিষ্টান)
➥ স্পিরিচুয়াল প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হলো মুমিন, মুসলমান

সামরিক শত্রু রাশিয়া এবং স্পিরিচুয়াল শত্রু মুমিন, মুসলমান

দৃশ্যমান ঘটনার অন্তরালে যা কিছুর আয়োজন তা দুই শক্তিকে পরাজিত করার জন্য হচ্ছে। এই মূহুর্তে রাশিয়া-আমেরিকা বহুল প্রতিক্ষিত শান্তি চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি চলছে। এ্যাস্কেটোলজিক্যাল গবেষণা অনুযায়ী এই চুক্তি হবে। এটি এমন না যে মুসলমানরা রাশিয়ার জন্য আর রাশিয়া মুসলমানদের জন্য। বরং যার যার স্বার্থ অনুযায়ী চলবে। এই স্বার্থের চূড়ান্ত জায়গায় দুপক্ষের মিল রয়েছে। সামরিক শত্রু তাদের মতো করে প্রতিপক্ষ মোকাবিলা করবে, তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে। এ বিষয়ে ভাবতে গেলেই কেনো জানি বারবার আমার রাজা হিরাক্লিয়াসের কথা মনে পরে। যাহোক, যতো চুক্তি হোক না কেনো তারা ঠিক সময়ে ঘুরে যাবে। কারণ সামরিক ও স্পিরিচুয়াল প্রতিদ্বন্দী উভয়ে একই পক্ষ দ্বারা আক্রান্ত। তারা একটা পর্যায়ে একত্রিত হবে, কারণ এটি প্রতিশ্রুত। কারণ তাদের শত্রু এক। চরম ধ্বংস, চরম মূল্য দেয়ার পরে হলেও সামরিক মোকাবিলা হবে রাশিয়ার সাথে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই শক্তিকে সামরিকভাবে ধ্বংস করবে। পাশে মুসলমান নেতা/প্রতিনিধি থাকবে। রাশিয়া কি চায় বা প্রেসিডেন্টের চাওয়া না চাওয়ার বিষয় এটি নয়। এমন কি তারাও যদি মানচিত্র পরিবর্তনের (গ্রেটার ইউরোপ) একই নকশায় কাজ করে থাকে এবং ভিতরে ভিতরে একই সিস্টেমের অংশ হিসেবেও কাজ করে তাহলেও তা বদলে যাবে। বিশেষ ইন্টারপ্রিটেশনের ভিত্তিতে বলতে পারি ব্যাখ্যায় ভুল না হলে এমনটি ঘটবে ইন শা আল্লাহ। নিশ্চয় আল্লাহু আলম। অন্যদিকে নেগেটিভ স্পিরিচুয়াল শক্তির মোকাবিলা হবে মুমিন, মুসলমানদের সাথে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

বিশ্ব ইতিহাসের প্রাচীন ও মধ্যযুগ মাল্টিপোলার ছিল। ক্ষেত্রবিশেষে আগেও ইউনিপোলার ক্ষমতার উদাহরণ দেখা গেছে, যেমন রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব (প্রাচীন ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড’), চীনের হান সাম্রাজ্য বা তাং সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ (১৯শ শতক)। তবে সবশেষ ইউনিপোলার সিস্টেমের মতো একচ্ছত্র আধিপত্যের উদাহরণ ইতিহাসে আর নেই। এখন ইতিহাসের পট পরিবর্তনের সময়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সময়।

নবী মুহাম্মদ সা. এর সময় (৬ষ্ঠ–৭ম শতাব্দী) নিচের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তি মিলে বহুকেন্দ্রিক বা মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থা ছিল।

১. বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য

  • পূর্ব ভূমধ্যসাগর, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, মিশর ও তুরস্কের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত।
  • সাংস্কৃতিক ও সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী।

২. সাসানীয় সাম্রাজ্য (পারস্য)

  • ইরান, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত।
  • সামরিক শক্তি ও প্রশাসনিক কাঠামোতে উন্নত।
  • বাইজেন্টাইনের সাথে দীর্ঘকালীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত। ৬০২-৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাইজেন্টাইনের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ চলে।

৩. আরব উপদ্বীপ

  • কেন্দ্রীয় কোনো রাষ্ট্র ছিল না।
  • মক্কা–মদিনার মতো শহর–রাষ্ট্র ছিল বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
  • ইয়েমেনে কিছু সময় ইথিওপিয়ার আকসুম সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল, পরে পারস্যের প্রভাবও দেখা যায়।

৪. অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি

  • অক্ষুমাইট (Aksum) সাম্রাজ্য (ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া)
  • ভারতীয় রাজ্যসমূহ
  • চীনের সুই ও তাং রাজবংশ

আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী ইউনিপোলার বা বাইপোলার নয়, বরং আদর্শ শ্রেণীবিন্যাস হলো মাল্টিপোলার বিশ্ব ব্যবস্থা। বর্তমান ইউনিপোলার সিস্টেম মানচিত্র বদলে যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে স্বপ্নের নতুন বিশ্ব গড়তে গ্রেট রিসেট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, এর ফলে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন একটি বিশ্ব মানচিত্র তৈরি হবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। হয়ত এই প্রকল্পের মধ্য দিয়েই নতুন একটি বিশ্ব গড়ে উঠবে। কিন্তু সেটি তাদের কল্পিত নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার মতো না, আল্লাহর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।

ধ্বংসের এমন চূড়ান্ত সময়ে কুশীলবদের মুখোশ ‍একের পর এক উন্মোচিত হবে। সুদ, ঘুষ, দুর্নীতিসহ হারাম উপর্জনকারীরা যেনো সব জেনেবুঝেও মুখোশধারীদের দলভুক্ত হবে। ভুল মতাদর্শ লালনকারী, দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষ, পাপাচারে লিপ্ত থাকা মানুষ, সবাই দলে দলে তাদের দলভুক্ত হবে। বলাই বাহুল্য যে এদের সংখ্যাই বেশি। এতো বেশি যে এই শ্রেণীর আস্ফালনের কাছে সত্যকে খুজে পাওয়াই দুষ্কর। গভীর সমুদ্রে মুক্তা খোঁজার মতো দুঃসাধ্য ব্যাপার। প্রতিটি ধাপে নিগূঢ় সত্যের সন্ধান তারাই পাবে যারা সর্বোপরি আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। সত্য-মিথ্যার এই চূড়ান্ত বিভাজন ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিভাজনের জেড় ধরেই চূড়ান্ত লড়াই হবে যা মূলত সত্যের সাথে দাজ্জাল ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে। সিন্ধান্ত যার যার – আসল শত্রুকে চিনবেন, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হবেন নাকি বিভ্রান্তিতে হারিয়ে যাবেন।

What do you think?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

GIPHY App Key not set. Please check settings

নতুন বিশ্ব ও বাংলাদেশ

নতুন বিশ্ব ও বাংলাদেশের পরিকল্পনা এবং পরিণতি