in ,

দাজ্জালের ধনভান্ডার, দুর্ভিক্ষ এবং আমাদের লাইফস্টাইল

শেষ জামানায় দাজ্জালের ‘ধনভান্ডার’ এবং ‘দুর্ভিক্ষ’ দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও আক্ষরিক দিক। ইসলামি এবং খ্রিস্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় দাজ্জাল বা অ্যান্টিক্রাইস্ট আত্নপ্রকাশের আগে ও সময়কালে তার ধনভান্ডার হবে মানুষের লোভ ও সত্যের ওপর অবিচল থাকার পরীক্ষা এবং দুর্ভিক্ষ হবে মানুষের ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর আস্থার পরীক্ষা।

সম্পদ হলো সূর্য, বাতাস এবং পানি যা ছাড়া অল্পকিছু মূহুর্ত আমরা বাঁচতে পারি অথচ তা সম্পূর্ণ ফ্রি। আয়ুর্বেদ ও আধুনিক বিজ্ঞানেও তিনটি সম্পদের এই তাৎপর্য ও গুরুত্ব প্রমাণিত। তিনটি সম্পদের গাণিতিক ভারসাম্য হলো একটি সুস্থ পৃথিবী। এই তিনটির যথাযথ ভারসাম্য হলো একটি সুস্থ শরীর। সম্পদ হলো প্রকৃতি প্রদত্ত নিয়ামত। সেটি শস্যবীজ হতে পারে অথবা খণিজ সম্পদ। এই সবকিছুকে তুচ্ছ করে আমরা প্রাধান্য দেই বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স, ক্যারিয়ার, সুখ্যাতি, দামি ফোন। কারণ মিথ্যা সম্পদকে আমাদের কাছে মোহনীয় করা হয়েছে। দাজ্জাল আমাদেরকে ম্যাটেরিয়াল অ্যাসেট দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখে প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদকে নষ্ট করার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় বীজ, শস্যভান্ডার, খণিজ সম্পদ, সূর্য, বাতাস, পানি সবকিছুর উপর কঠর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছে। আর আমরা প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ হারিয়ে মিথ্যা সম্পদের মধ্যে ডুবে আছি। ফিতরাতকে ধ্বংস করার কাছে কুশিলবদের নীল নকশা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্রের পাশাপাশি সাধারণ মানুষরাও জেনে বা না জেনে সাহায্য করে চলেছি প্রতিনিয়ত।

অর্জিত মিথ্যা সম্পদ দিয়ে পুনরায় যা কনজিউম করি সেগুলোও মিথ্যা। দামি রেস্ট্রুরেন্টে কৃত্তিম খাবার (প্রক্রিয়াজাত খাবার) খাই। অস্বাস্থ্যকর এসির বাতাস। ইদানিং খাবার থেকে পুষ্টি না নিয়ে দামি ফুড সাপ্লিমেন্ট কিনি। সূর্য থেকে ভিটামিন ডি না নিয়ে দামি সাপ্লিমেন্ট ট্যাবলেটের উপর নির্ভরশীল হয়ে পরছি। পায়ে না হেঁটে দামি গাড়িতে চড়ে জিমে যাওয়া আজকাল স্টাটাসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে লাইফস্টাইলে বাহ্যিক পরিবর্তন আসলেও প্রকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। ফিতরাত ধ্বংস হওয়ার পথে। প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ ধ্বংস হওয়ার পথে। যার সরাসরি প্রভাব পরে আমাদের লাইফস্টাইলে। দামি দামি খাবার খাচ্ছি অথচ পুষ্টি নেই। ঔষধে রোগ সারেনা, বড়জোড় সাময়িক দমিয়ে রাখে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। দামি গাড়ি, বাড়ি, সুখ্যাতি সব আছে তারপরও ঘুম আসেনা। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট অর্জন করার পরও দৈন্য চিন্তার মুক্তি হয়নি। সুখ-স্বাচ্ছন্দের জন্য ইউরোপ আমেরিকা গিয়েও সুখ ধরা দেয়নি। এই সবকিছুর কারণ আমরা প্রকৃত সম্পদ এবং ফিতরাতকে তুচ্ছ করে মিথ্যা সম্পদের পিছে ছুটে বেড়াই। লোভ ও সত্যের ওপর অবিচল থাকার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে দাজ্জালের ধনভান্ডারে আকৃষ্ট হই। দাজ্জালও তার মিথ্যা ধনভান্ডার উন্মোচিত করে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে এবং হয়ত খুব শীঘ্রই সেই ধনভান্ডার নিয়ে কৃত্তিম সংকট তৈরির মাধ্যমে চরম দুর্ভিক্ষ বা গ্রেট ট্রিবুলেশন -এর চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে। হাদিস ও বাইবেলে যার সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু কি সেই ধনভান্ডার? কিভাবে দুর্ভিক্ষ বা গ্রেট ট্রিবুলেশন ঘটানো হচ্ছে? মুক্তির উপায়ইবা কি?

দাজ্জালের ধনভান্ডার ও দুর্ভিক্ষ: এস্কেটোলজিক্যাল ব্যাখ্যা

সংক্ষেপে, দাজ্জালের ধনভান্ডার হলো তার মিথ্যা দাবির সপক্ষে একটি অলৌকিক প্রলোভন, মিথ্যা আশ্বাস, ধোঁকা যা দিয়ে সে মানুষের ঈমান হরণ করে। সূর্য, বাতাস এবং পানি আমরা প্রকৃতি থেকে পেয়ে আসছি। সাধারণ দৃষ্টিতে এগুলো নষ্ট হওয়ার কিছু নেই মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলোই দাজ্জালের মূল হাতিয়ার। পাশাপাশি প্রকৃতি প্রদত্ত বীজ, শস্যভান্ডার এবং খণিজ সম্পদ। প্রযুক্তি ও নিত্য নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এই সম্পদগুলোকে কুক্ষিগত করা হয়। সম্পদের ফিতরাত নষ্ট করা হয়। আবার সেই সম্পদকে জিম্মি করেই দুর্ভিক্ষ বা গ্রেট ট্রিবুলেশন ঘটানোর চক্রান্ত করা হয় যার চূড়ান্ত ছোবল এখন আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে শেষ জামানার আলোচনা থেকে দাজ্জালের ধনভান্ডার ও দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায় যা নিচে তুলে ধরা হলো।

হাদিস- ধনভান্ডার ও দুর্ভিক্ষ

“দাজ্জাল এক জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। এতে তারা ঈমান আনবে। দাজ্জাল তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্য আকাশকে আদেশ দিবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে, যমিন ফসল উৎপন্ন করবে এবং তাদের পশুপাল ও চতুষ্পদ জন্তুগুলো অধিক মোটা-তাজা হবে এবং পূর্বের তুলনায় বেশী দুধ প্রদান করবে। অতঃপর অন্য একটি জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। লোকেরা তার কথা প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাদের নিকট থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসবে। এতে তারা চরম অভাবে পড়বে। তাদের ক্ষেত-খামারে চরম ফসলহানি দেখা দিবে। দাজ্জাল পরিত্যক্ত ভূমিকে তার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের করতে বলবে। গুপ্তধনগুলো বের হয়ে মৌমাছির দলের ন্যায় তার পিছে পিছে চলতে থাকবে।’’ – সহিহ মুসলিম

বাইবেল- সম্পদের নিয়ন্ত্রণ

বাইবেলে অ্যান্টিক্রাইস্ট সম্পর্কে বলা আছে। বুক অফ রেভেলেশনে (অধ্যায় ১৩) Beast নামে এক শক্তির কথা বলা হয়েছে, যে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করবে যেখানে কেউ কিনতে বা বিক্রি করতে পারবে না যদি তার “চিহ্ন” না থাকে (Mark of the Beast)। বুক অফ ড্যানিয়েল (১১:৩৮–৪৩) -এ উল্লেখ আছে যে সে সোনা-রূপা ও মূল্যবান জিনিসের উপর কর্তৃত্ব করবে এবং বিভিন্ন দেশের ধনসম্পদ দখল করবে। এখান থেকে পাওয়া যায়, প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পদ থেকে শুরু করে খাদ্যশস্যসহ খণিজ সম্পদ, অর্থনীতি, রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বুক অফ রেভেলেশন (অধ্যায় ৬) –এ দুর্ভিক্ষের উল্লেখ আছে। অর্থাৎ প্রকৃত সম্পদ সীমিত হয়ে যাবে, পুষ্টিকর খাদ্য কমে যাবে, যা অবশিষ্ট থাকবে তারও দাম বেড়ে যাবে।

হিন্দু ধর্ম– দুর্ভিক্ষ ও মহাবিপর্যয়

হিন্দু ধর্মে বর্তমান যুগকে কলিযুগ বলা হয় যা চার যুগের শেষ ও সবচেয়ে অবনমিত যুগ। কলিযুগের শেষ সময়ে দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারত, ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ শাস্ত্রে কলিযুগ শেষের লক্ষণ হিসেবে বলা আছে ধর্ম-নীতি ভেঙে পড়বে, প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হবে, অনিয়মিত বৃষ্টি ও খরা হবে, খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে। দুর্ভিক্ষ, মহামারি, যুদ্ধ – সব একসাথে বৃদ্ধি পাবে।

দাজ্জালের ধনভান্ডার ও ফিতনার মূল দিক সমূহ:

বিশাল প্রাচুর্য: দাজ্জাল তার ধনভান্ডার এবং অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে মানুষকে প্রলুব্ধ করবে। মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা, বৃষ্টি নামানো এবং মাটিকে ফসলে ভরিয়ে দেওয়ার মতো কাজ করবে। দাজ্জালের সাথে ‘রুটির পাহাড়’ এবং ‘পানির নহর’ থাকবে। এর মানে হলো, তার কাছে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও পানীয়ের মজুদ থাকবে। সেই সময় বিশ্বে এক চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে, আর দাজ্জাল এই খাদ্যভাণ্ডারকে প্রলোভন হিসেবে ব্যবহার করবে। যারা তাকে রব হিসেবে স্বীকার করবে, সে তাদের জমিতে বৃষ্টি বর্ষণ করবে এবং তাদের গবাদিপশুগুলো হৃষ্টপুষ্ট ও দুধে ভরপুর হয়ে উঠবে।

জান্নাত ও জাহান্নাম: দাজ্জালের সাথে একটি জান্নাত ও জাহান্নামের নমুনা থাকবে, যা আসলে তার ধনভান্ডার ও শক্তির রূপক। তার কাছে যা জান্নাত (খাদ্য, সুখ-শান্তি) মনে হবে তা প্রকৃতপক্ষে জাহান্নাম, আর যা জাহান্নাম (কষ্ট) মনে হবে তা-ই জান্নাত।

পরীক্ষা: দাজ্জাল হবে শেষ জামানার সবচেয়ে বড় ফিতনা, যার আবির্ভাবের সময় অভাবী মানুষকে সে তার এই অলৌকিক ধনভান্ডার দিয়ে পরীক্ষা করবে। তার ধনভান্ডারের মোহে পড়ে দুর্বল ঈমানের মানুষজন দাজ্জালকে রব হিসেবে মেনে নিবে।

দুর্ভিক্ষ: দাজ্জালের অন্যতম ফিতনা বা ক্ষমতা হলো চরম অভাব ও দুর্ভিক্ষের সময় তার কাছে প্রচুর শস্যভান্ডার বা ফসলের প্রাচুর্য থাকবে, যা দিয়ে সে ঈমানদারদের প্রলুব্ধ করবে, যা সে তার অনুসারীদের বিলাবে। তার এই শস্যভান্ডার মূলত আসমান ও যমীনকে তার আদেশে ফসল ও বৃষ্টি দিতে বাধ্য করার একটি ঐন্দ্রজালিক বা শয়তানী ক্ষমতা, যার মাধ্যমে সে মানুষকে নিজের খোদা হিসেবে মানতে বাধ্য করবে। যারা অস্বীকার করবে তাদের মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে, তীব্র অভাব ও দুর্ভিক্ষে পড়বে।

বাস্তব উদাহরণ: বর্তমান সময়ে অনেকে হাইব্রিড, জিএমও (GMO) ফসল, বীজ ও খাদ্য মজুদ, প্রকৃতিক সম্পদ, খণিজ সম্পদ, পানি সম্পদসহ সকল সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট শক্তির নিয়ন্ত্রণকে রূপক অর্থে দাজ্জালের ধনভান্ডার হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। নিয়ন্ত্রণের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং দাজ্জাল আত্নপ্রকাশের সময়কালে কঠর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই সম্পদগুলোকেই জিম্মি করা হবে।

গ্রেট ট্রিবুলেশন

গ্রেট রিসেশন বা গ্রেট ডিপ্রেশন না; গ্রেট ট্রিবুলেশন। গ্রেট ট্রিবুলেশন (মহাক্লেশ) বলতে এমন এক সময়কে বোঝানো হয় যখন পৃথিবীতে দুর্যোগ, দুর্ভোগ, যুদ্ধ এবং নৈতিক অবক্ষয় এমনই এক চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে যা না অতীতে কখনও হয়েছে, না ভবিষ্যতে হবে। এটি একবারই হওয়ার কথা উল্লেখ পাওয়া যায় বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট অংশে, যেমন: বুক অফ ম্যাথিউ (২৪ অধ্যায়) এবং বুক অফ রেভেলেশনে। ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই সময়ে বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খড়া), যুদ্ধ ও অশান্তি লেগেই থাকবে, মিথ্যা মাসিহ ও মহা প্রতারকদের উত্থান ঘটবে এবং মানুষের নৈতিকতা ভেঙে পড়বে। হাদিসে উল্লেখিত দাজ্জাল আত্নপ্রকাশের আগে ও তার সময়কালের দুর্ভিক্ষ এবং বাইবেলে উল্লেখিত গ্রেট ট্রিবুলেশনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই।

বাইবেলে উল্লেখ পাওয়া যায়, “কারণ সেই সময়ে এমন মহাক্লেশ উপস্থিত হবে, যা জগতের আরম্ভ থেকে এ পর্যন্ত কখনও হয়নি এবং কখনও হবেও না।” ধর্মতাত্ত্বিকরা মনে করেন, এই সময়টি হবে ৭ বছর ব্যাপী। সময়টি দুই ভাগে বিভক্ত – প্রথম সাড়ে তিন বছর কিছুটা সহনীয় হলেও শেষের সাড়ে তিন বছর হবে চরম ভয়াবহ।

বাইবেলের গ্রেট ট্রিবুলেশন সম্পর্কে জানা এ কারণে জরুরী যে, পশ্চিমা কুশিলবরা এগুলো অনুসরণ করে তাদের চক্রান্তের নকশা তৈরি করে।

গ্রেট ট্রিবুলেশন কি শুরু হয়ে গেছে?

ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থেকে এর ভিন্ন ভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। এখানে আমার মতো করে উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা করবো। বাইবেল বিশেষজ্ঞদের মতে গ্রেট ট্রিবুলেশন শুরুর কতগুলো শর্ত বা ট্রিগার প্রয়োজন যেগুলো হলো:

➥ অ্যান্টিক্রাইস্টের সাথে শান্তি চুক্তি। বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী (দানিয়েল ৯:২৭) অনুযায়ী, একজন বিশ্বনেতা (অ্যান্টিক্রাইস্ট) ইসরায়েলের সাথে ৭ বছরের একটি শান্তি চুক্তি করবেন। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মাধ্যমেই গ্রেট ট্রিবুলেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।

➥ একই সাথে একক বিশ্ব শাসন ও তৃতীয় মন্দিরের যাত্রা শুরুর পালা বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

বাইবেলে উল্লেখিত শান্তি চুক্তি আর হাদিসে উল্লেখিত রোমান-মুসলমান সন্ধি চুক্তির মধ্যে অনেক সাদৃশ্য আছে। দুটির একই উদ্দেশ্য আর তা হলো ইসরায়েল রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করা। এই চুক্তিটি হলো আব্রাহাম অ্যাকর্ডস যা আগের একটি লেখায় প্রমাণসহ তুলে ধরি। একাধিক আরব দেশের সাথে ইতিমধ্যে এই চুক্তি হয়ে গেছে। বাকি আছে কেবল সৌদি আরব, যা বর্তমান আলোচনার টেবিলে আছে এবং যেকোন মূহুর্তে হয়ে যাবে।

বলা যায় আমরা এই মূহুর্তে গ্রেট ট্রেবুলেশন শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে আছি অথবা এগুলো শুরুর পূর্বাভাস। ঝড় আসার আগের মেঘলা আকাশের মতো। তবে হালকা ঝড় শুরু হয়ে গেছে এমনটাই মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে আমার পরামর্শ হলো সৌদি আরবের সাথে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তি হওয়ার সাথে সাথে দুর্ভিক্ষের প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করা উচিত।

দাজ্জালের খাদ্যভান্ডার

খাদ্যশস্যের বৈশিষ্ট এবং সমসাময়িক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থেকে বলা যায় যে, বর্তমান হাইব্রিড এবং জিএমও ফসলই হলো দাজ্জালের সেই খাদ্যভান্ডার, জিএমও গম হলো তার সেই রুটির ভান্ডার। রূপক ও আক্ষরিক উভয় অর্থে এর ব্যাখ্যা করা যায়। দাজ্জাল যেমন মহা ধোকাবাজ তার খাদ্যভান্ডারও ধোকায় পরিপূর্ণ। এসব ফসল উৎপাদনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন দেশীয় বীজ প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে তেমনি বাজার দখল হয়ে গেছে হাইব্রিড ও জিএমও ফসলে। উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ কিন্তু আগের সেই পুষ্টিগুণ নেই বরং এসব খাবার দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ঝুকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। একদিকে কৃষকরা দেশীয় বীজ হারালো, অন্যদিকে বীজের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলো কর্পোরেটদের হাতে। গরু আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি দুধ দিচ্ছে কিন্তু সেখানেও একই কথা। আগের সেই পুষ্টিগুণ নেই। সচেতন মানুষ এখনই ভ্যাক্সিন ছাড়া গরুর মাংস ও দুধ খুজে বেড়ায়।

এবার এসব খাদ্যভান্ডারের সাথে উপরের এস্কেটোলজিক্যাল ব্যাখ্যা মিলিয়ে দেখুন। সন্দেহাতীতভাবে এসব খাবারই দাজ্জালের খাদ্যভান্ডার। এসব বীজের উপর যেভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং দাজ্জাল আত্নপ্রকাশের আগে পরে এর মাধ্যমে মানুষকে জিম্মি করা হবে।

স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট

স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট (Svalbard Global Seed Vault) হলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শস্যবীজের একটি ‘ব্যাকআপ ব্যাংক’। এটি আর্কটিক মহাসাগরের স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে, নরওয়ের স্পিটসবার্গেন দ্বীপে অবস্থিত একটি নিরাপদ বীজ ব্যাংক ৷ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বীজ ভাণ্ডার হিসেবে এটি পরিচিত। স্বালবার্ড বৈশ্বিক বীজ ভান্ডারকে “মানবজাতির বীমা” বলা হয়, কারণ এটি ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। এটি বিভিন্ন দেশের কৃষিজ বীজ যেমন, ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি হাজার হাজার প্রজাতির বীজ সংরক্ষণ করে রাখে যাতে পৃথিবীর কোথাও কোনো ফসলের প্রজাতি নষ্ট হয়ে গেলে এখান থেকে আবার তা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। এটিকে ‘ডুমসডে ভল্ট’ (Doomsday Vault) বা ‘কেয়ামতের গুদাম’ বা ‘মহাপ্রলয়ের বীজ ভান্ডার’ বলা হয়, কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিকম্প, বন্যাসহ বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, যুদ্ধ বা পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞে যদি পৃথিবীর কোনো দেশের স্থানীয় ফসলের জাত হারিয়ে যায়, তবে এখান থেকে সেই বীজ নিয়ে পুনরায় চাষাবাদ শুরু করা সম্ভব হবে। এই প্রকল্পকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে যেকোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় এমনকি পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞেও যেনো টিকে থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পরিচালিত প্রকল্প যেখানে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বড় বড় কৃষি গবেষণা সংস্থা এর সাথে যুক্ত। এখানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশ তাদের নিজস্ব দেশীয় শস্য বীজের নমুনা বিনামূল্যে জমা রেখেছে।

স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট বা ডুমস ডে ভল্ট যা কেয়ামতের গুদাম নামেও পরিচিত।

দাজ্জালের শস্যভান্ডারের সাথে এই সিড ভল্টের কোন সম্পর্ক আছে কিনা এআইকে এমন প্রশ্ন করা হলে নিচের উত্তর পাওয়া যায়:

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ (বিশেষ করে ইসলাম ও খ্রিষ্টান এস্কেটোলজি বা শেষ জামানার আলোচনা) থেকে দাজ্জালের ফেতনার সময় চরম দুর্ভিক্ষ বা খাদ্যাভাবের কথা বলা হয়েছে। এই ধারণার সাথে মিলিয়ে ইন্টারনেটে কিছু মানুষ দাবি করেন যে:

“বিশ্বের ধনী ব্যক্তি ও শাসকরা দাজ্জালের জন্য খাদ্য বা বীজ স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্টে জমা করছেন।”

কেন রহস্য তৈরি হলো?

এটি উত্তর মেরুর খুব কাছে বরফে ঢাকা এক দুর্গম পাহাড়ে অবস্থিত, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। এছাড়া এর ভেতরে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং হিমাঙ্কের অনেক নিচে তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়। এসব কারণে অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় এটিকে দাজ্জালের শস্যভাণ্ডার হিসেবে উপস্থাপন করা হয় দর্শকদের আকর্ষণ করার জন্য।

তবে উদ্যোক্তাদের যুক্তি অনুযায়ী এসব ভিত্তিহীন আলোচনা। কারণ:

এটি কোনো গোপন জায়গা নয়: এটি সম্পূর্ণ প্রকাশ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পরিচালিত। কোন ঐশ্বরিক শক্তি নয় বরং জাতিসংঘ এবং বিশ্বের বড় বড় কৃষি গবেষণা সংস্থা, উন্নত দেশ এবং বড় বড় বিজ্ঞানীরা এর সাথে জড়িত।

মালিকানা বহাল থাকবে: বাংলাদেশ যদি সেখানে ধানের বীজ রাখে, তবে সেই বীজের ওপর একমাত্র অধিকার বাংলাদেশেরই থাকবে। অন্য কেউ বা কোনো গোপন গোষ্ঠী চাইলেই তা নিয়ে নিতে পারবে না। যেমন— সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তাদের নিজস্ব জিন ব্যাংক ধ্বংস হয়ে যাওয়ায়, তারা স্বালবার্ড ভল্ট থেকে বীজ তুলে নিয়ে মরক্কো ও লেবাননে নতুন করে চাষ করেছিল এবং পরে আবার বীজ ফেরত দিয়েছিল।

উদ্দেশ্য মানব কল্যাণ: এটি কোনো অশুভ শক্তির জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা।

এআই এর তথ্য অনুযায়ী খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে মানুষের মনে ভয় থাকা স্বাভাবিক, আর সেখান থেকেই এই ধরনের তত্ত্বগুলোর জন্ম হয়। তবে বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক নথিপত্র অনুযায়ী এটি মানবজাতির আত্মরক্ষার একটি চমৎকার উদ্যোগ।

সিড ভল্টের বাস্তবতা

এবার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবতার নিরিখে কিছু তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। প্রথমে, বলা হচ্ছে এটি বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ করছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা পারমাণবিক যুদ্ধে কোন বীজ হারিয়ে গেলে পুনরায় তা সেই দেশকে ফেরত দেয়া হবে। এখানেই শুভঙ্করের ফাঁকি। ভালো করে খেয়াল করুন, বিশ্বে সেরকম বিপর্যয় এখনও হয়নি। তার আগেই দেশীয় বীজ উধাও হয়ে গেছে। দেশে বিদেশে হাইব্রিড ও জিএমও বীজে বাজার দখল হয়ে গেছে। যেমন, গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৮০টিরও বেশি বেগুনের জার্মপ্লাজম বা স্থানীয় বৈচিত্র্য ছিল। কোথায় গেলো? নিশ্চয় গ্লোবাল সিড ভল্টে এগুলো সংরক্ষিত আছে। কিন্তু এগুলো বাজারে আর পাওয়া যায় না। তথাকথিত উন্নত জাতের বেগুন এবং বিটি বেগুনের তোপে দেশীয় জাত হারিয়ে গেলো। অথচ এই বিটি বেগুন ভারতে ২০১০ সালে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। ২০১৫ সালে ফিলিপাইনে বিটি বেগুনের মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা স্থায়ীভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়। তবে ২০২১ সালে পুনরায় অনুমতি দেওয়া হলেও ২০২৪ সালে আবারও বিটি বেগুনসহ গোল্ডেন রাইসের বাণিজ্যিক চাষ বন্ধের নির্দেশ দেই। এছাড়া অনেক উন্নত দেশে সরাসরি বিটি বেগুনের কথা উল্লেখ না করলেও জিএমও নীতিমালার আওতায় এটি নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত। কারণ:

➥ পরিবেশগত ঝুঁকি: দেশি জাতের বেগুনের সাথে পরাগায়ন হয়ে আদি জাতের বিলুপ্তি ঘটার ভয়।

➥ স্বাস্থ্য ঝুঁকি: মানবদেহে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব, এলার্জি বা নতুন ধরনের টক্সিন তৈরির আশঙ্কা।

➥ বীজ নির্ভরশীলতা: কৃষকরা বীজ সংরক্ষণের ক্ষমতা হারিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ভয়।

সব ভয় ও আশঙ্কাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশে ২০১৪ সাল থেকে বারি বিটি বেগুন (১, ২, ৩ ও ৪) এর বাম্পার চাষবাস হচ্ছে!

বিটি বেগুন বাংলাদেশে কিভাবে আসলো তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেখুন:

বিটি বেগুনের মূল প্রযুক্তি ‘Cry1Ac’ জিনটি এসেছিল ভারতের মাহিকো (Mahyco) নামক প্রতিষ্ঠান থেকে। মাহিকো এই প্রযুক্তিটি মনসান্তো (Monsanto) থেকে সংগ্রহ করেছিল।

একটি আন্তর্জাতিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশে আসে:

  • মাহিকো (Mahyco): প্রযুক্তি প্রদানকারী।
  • কর্নেল ইউনিভার্সিটি (Cornell University) ও ইউএসএআইডি (USAID): কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী (ABSPII প্রকল্পের মাধ্যমে)।
  • সতগুরু ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস: সমন্বয়কারী।

মূল প্রযুক্তি কোথায় থেকে সংগ্রহ করা হয়? উত্তর হলো মনসান্তো। এখানেই আসল কথা! আশা করি মনসান্তো সম্পর্কে মানুষ এখন খুব ভালোভাবে অবগত।

প্রায় সব দেশের স্থানীয় বীজের একই অবস্থা। দেশীয় বীজ উধাও, বিপরীতে হাইব্রিড ও জিএমও বীজের খাদ্যশস্যে বাজার দখল হয়ে গেছে। এটি কিভাবে হলো? কারা করলো? শুধুই কি অধিক চাহিদা পুরণের জন্য হাইব্রিড জাত, বিটি বেগুন, জিএমও আনা হলো? কৃষকরা কি কেবলই অধিক ফলনের আশায় এগুলো চাষ করা শুরু করলো? নাকি এর পিছনে সুদূরপ্রসারী কোন চক্রান্ত আছে? যদি চক্রান্ত না থাকে তাহলে কেনো দেশীয় নিম গাছ পর্যন্ত উধাও হয়ে যাচ্ছে। তথাকথিত উন্নত জাতের নিম গাছের আড়ালে দেশীয় নিম বা জাত নিম বলে যেটা পরিচিত সেটা এখন খুজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে গেছে। অথচ দেশীয় নিম গাছের গুণাগুণের সাথে তথাকথিত উন্নত জাতের নিম গাছের কোন তুলনায় হয়না। এগুলো কিভাবে হলো? কারা করলো? প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা!

ভ্যাক্সিন দেয়া গরুর দুধ বা মাংস থেকে পুষ্টির চাহিদা পুরণ হবে না। কৃত্তিম উপায়ে মোটাতাজাকরণ করে দ্বিগুণ/তিনগুণ উৎপাদন করা প্রাণীজ উৎস থেকে ভিটামিন ও প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে না। তেমনি হাইব্রিড ও জিএমও ফসল দিয়েও পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে না। উল্টা দীর্ঘমেয়াদে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার নামে কৌশলে দেশীয় বীজ কেড়ে নিয়ে কৃষকের হাতে বিষের বোতল ও রাসায়নিক সারের বস্তা ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন দেশীয় জাত ফিরিয়ে আনাতো দূরের কথা, ভীনদেশী জাতের উপরও কৃষকের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কঠর থেকে কঠরতর হবে এবং দাজ্জাল আত্নপ্রকাশের সময়কালে এগুলোকেই জিম্মি করা হবে।

সম্ভবত ২০১৭ সালে রাশিয়ান গবেষক জাতিসংঘের ১৭টি এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত উদ্দেশ্য ডিকোড করে যার সত্যতা এখন সারা বিশ্বে সচেতন মহলের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। এর মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ১৫ (SDG 15) ছিল:

“স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা, টেকসই ববহারে পৃষ্টপোষকতা, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ প্রক্রিয়ার মোকাবেলা, ভূমির অবক্ষয় রোধ ও ভূমি সৃষ্টি প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবন এবং জীববৈচিত্র হ্রাস প্রতিরোধ।”

ডিকোডকৃত লক্ষ্যমাত্রা হলো:

অন্য সবার জন্য সম্পদ ধ্বংস হওয়ার পর সম্ভাব্য প্রতিটি বীজ নিজেদের জন্য সিড ভল্টে (Svalbard Global Seed Vault) সংরক্ষিত আছে কিনা তা নিশ্চিত করা।

আলবার্ট পাইকের মতে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের নকশা করা হয়। এ যুদ্ধে কৃত্তিম আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি থেকে শুরু করে আধুনিক মরণাস্ত্র এমন কি পরমাণু অস্ত্রও ব্যবহার হতে পারে। ডিকোডকৃত লক্ষ্যমাত্রার ব্যাখ্যা হলো, যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে কুশিলবরা ডুমসডে প্লেনে অথবা আন্ডাগ্রাউন্ড ব্যাঙ্কারে চলে যাবে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংসলীলা, ডিপপুলেশনের পর ফিরে এসে কল্পিত নতুন বিশ্বে সংরক্ষিত বীজ দিয়ে মানুষকে সহজেই জিম্মি করা যাবে এবং নতুন করে ফসল উৎপাদনের জন্য প্রকৃতি প্রদত্ত বীজ সংরক্ষণ করাই গ্লোবাল সিড ভল্টের কাজ।

আশা করি রহস্যের জট খুলে গেছে। এবং এটাও আশা করি যে, মহাদুর্যোগ বা পরমাণু যুদ্ধের পরও যেনো এটি টিকে থাকে এবং বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দেশীয় বীজগুলো সত্যি সত্যি নিজ নিজ অঞ্চল ফিরে পায়। কারণ আমরা জানি কুশিলবদের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে না। কিন্তু বীজগুলো টিকে থাক এবং মানুষের কাছে ফিরে যাবে এটাই প্রত্যাশা।

জিও ইঞ্জিনিয়ারিং

জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং (Geoengineering) বা জলবায়ু প্রকৌশল হলো পৃথিবীর জলবায়ুকে মানুষের ইচ্ছামতো প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ, যেখানে পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থাকে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়। উদ্যোক্তাদের মতে এর লক্ষ্য গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা। সহজ কথায়, তাদের মতে প্রযুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর পরিবেশকে শীতল করার চেষ্টাই হলো জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং।

কিন্তু এসব গৎবাঁধা ব্যাখ্যার আড়ালে আরো অনেক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রকৃতি প্রদত্ত সূর্য, বাতাস ও পানি সম্পদের ফিতরাতকে নষ্ট করা, এগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং জিম্মি করার মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে কিনা সেগুলোই এই আলোচনার মূল বিষয়।

ETC Group এবং Heinrich Böll Foundation -এর মতো সংস্থাগুলোর ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২,০০০টিরও বেশি জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে ২০১২ সালে এই প্রকল্পের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০ টির কাছাকাছি। প্রকল্পগুলো মূলত নিচের তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:

১. সোলার রেডিয়েশন ম্যানেজমেন্ট (SRM): সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখার প্রযুক্তি (যেমন: স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক অ্যারোসল ইনজেকশন)।

২. কার্বন ডাই অক্সাইড রিমুভাল (CDR): বায়ুমণ্ডল থেকে সরাসরি কার্বন শুষে নেওয়া (যেমন: ডাইরেক্ট এয়ার ক্যাপচার)।

৩. ওয়েদার মডিফিকেশন: আবহাওয়া পরিবর্তন বা কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের প্রকল্প।

এগুলোর মধ্যে সোলার জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং উদ্যোক্তাদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সোলার জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণায় অর্থায়ন বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।

সোলার জিও ইঞ্জিনিয়ারিং

সূর্যকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে যেটাকে সোলার জিওইন্জিনিয়ারিং বা সৌর ভূ-প্রকৌশল বলা হয়। উদ্যোক্তাদের মতে সোলার জিওইঞ্জিনিয়ারিং (Solar Geoengineering) হলো জলবায়ু পরিবর্তন কমানোর জন্য প্রস্তাবিত একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যেখানে সূর্যের আলো বা তাপের কিছু অংশ মহাকাশে প্রতিফলিত করে ফেরত পাঠানো, যাতে পৃথিবীর তাপমাত্রা না বাড়ে। এটি মূলত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (Global Warming) ঠেকানোর একটি “শর্টকাট” বা জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সোলার জিওইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রধান কয়েকটি পদ্ধতি হলো:

১. স্ট্র্যাটোসফেরিক অ্যারোসল ইনজেকশন (SAI): যার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে (stratosphere) ক্ষুদ্র কণা (যেমন সালফার) ছড়ানো হয়। এগুলো সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে।

২. মেরিন ক্লাউড ব্রাইটেনিং (MCB): সমুদ্রের ওপরের মেঘকে উজ্জ্বল করা হয় এতে বেশি সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়।

৩. স্পেস মিরর (তাত্ত্বিক ধারণা): মহাকাশে বিশাল আয়না বা পর্দা স্থাপন করে পৃথিবীতে আসা সূর্যের আলোর পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া।

জিও ইঞ্জিনিয়ারিং, সোলার জিও ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিল গেটসের ডিমিং দ্যা সান প্রকল্প।

বিল গেটসের ডিমিং দ্যা সান প্রকল্প

বিল গেটস সরাসরি এই প্রকল্পটি পরিচালনা না করলেও, তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একটি উচ্চাভিলাষী গবেষণায় অর্থায়ন করেছেন, যা “Dimming the Sun” প্রকল্প নামে পরিচিতি পায়।

এই প্রকল্পের আসল নাম হলো SCoPEx (Stratospheric Controlled Perturbation Experiment)। এটি সোলার জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির একটি অন্যতম বাস্তবসম্মত পরীক্ষা।

SCoPEx প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য

প্রকল্পের লক্ষ্য হলো বায়ুমণ্ডলে এমন কিছু কণা ছড়িয়ে দেওয়া যা সূর্যের আলোকে মহাকাশে ফেরত পাঠিয়ে দিবে এবং পৃথিবীকে শীতল রাখবে। প্রধান ধাপগুলো হলো:

১. বেলুন মিশন: ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উপরে (স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে) একটি বিশেষ বেলুন পাঠানো।

২. কণা নিঃসরণ: এই বেলুনটি খুব সামান্য পরিমাণে (২ কেজির মতো) ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($CaCO_3$) গুঁড়ো আকাশে ছড়িয়ে দিবে।

৩. পর্যবেক্ষণ: বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখবেন এই কণাগুলো বাতাসের রসায়নের সাথে কীভাবে বিক্রিয়া করে এবং কতটুকু সূর্যালোক প্রতিফলিত করে।

তবে প্রকল্পগুলো শুরু থেকেই প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়েছে এবং সুইডেনে প্রথম মিশন বাতিল হয়ে যায়। ২০২১ সালে সুইডেনে বেলুন ওড়ানোর কথা থাকলেও আদিবাসী গোষ্ঠী (Saami) এবং পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের মুখে তা স্থগিত করা হয়। ২০২৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি বন্ধ ঘোষণা করে। তবে জিওইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কাজ করা SRM360 প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যায়, ২০২২ সালে দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড থেকে উৎক্ষেপিত একটি বেলুনের মাধ্যমে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে প্রায় ৪০০ গ্রাম সালফার ডাইঅক্সাইড নির্গত করা হয়েছিল। যে প্রকল্পের অধিনে সফলভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হয় তার নাম ছিল SATAN (Stratospheric Aerosol Transport and Nucleation)। ২০২৫ সালে এই খবর তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে এবং সম্প্রতি এ ধরনের খবরগুলো নিয়ে উন্নত বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা এমনকি আন্দোলন-বিক্ষোভ শুরু হয়ে গেছে। প্রকল্পগুলোর কম্পিউটার মডেলিং এবং ছোট পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে এমন খবর অফিসিয়ালি স্বীকার করা হলেও প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে বা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়নি।

জিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ঝুঁকি ও বিতর্ক

যদিও এর বড় কোনো প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি, কারণ এর আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত জটিল। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড কমানোর বিকল্প নয়, বরং বড় কোনো বিপর্যয় এড়ানোর সাময়িক ঢাল মাত্র। এটি বৃষ্টির ধরণ বদলে দিতে পারে, যা কৃষি ও বাস্তুসংস্থানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। ওজোন স্তরের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। অনেকে মনে করেন এটি করলে দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর আসল কাজ থেকে পিছিয়ে আসবে (Moral Hazard)। আবহাওয়ার প্যাটার্ন বদলে যেতে পারে (যেমন বৃষ্টি কমে যেতে পারে) কিছু অঞ্চলে বন্যা বা খরা বাড়তে পারে অথচ সমস্যার মূল কারণ (গ্রিনহাউস গ্যাস) সমাধান করে না। বন্যা ও খরার লাগামহীন বৈপরীত্য কৃষি, অর্থনীতি এবং লাইফস্টাইলের উপর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এটি প্রকৃতির সাথে “ঝুঁকিপূর্ণ হস্তক্ষেপ” যার ফলে আবহাওয়া অনিশ্চয়তার দিকে চলে যেতে পারে। তাছাড়া কোন দেশ জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ করবে বা কার ক্ষতি হলে কে দায় নেবে, তা নিয়ে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকির ব্যাপার হলো কোনো কারণে এই সিস্টেম হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে টার্মিনেশন শক “termination shock” হতে পারে যার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা এক লাফে অনেক বেড়ে যাবে, যা সামলানো অসম্ভব। এ কারণে অনেক দেশে এগুলো নিয়ে কড়া আইনি বিধিমালা বা ‘মোরোটোরিয়াম’ (সাময়িক নিষেধাজ্ঞা) রয়েছে। এতো ঝুকি থাকার পরও এর কাজ থেমে নেই। কোন এক অদৃশ্য মহাশক্তি যেনো সবকিছুকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই শক্তি ইতিমধ্যে চিহ্নিত। কারণ এস্কেটোলজিক্যাল ব্যাখ্যা থেকে জানি যে, আমাদের পরীক্ষার জন্য শেষ জামানায় আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কার হাতে থাকবে।

পানি সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ

পানি সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ বলতে সমুদ্র, নদী, হ্রদ, ভূগর্ভস্থ পানি ও বৃষ্টির পানির ব্যবহার, বণ্টন ও ব্যবস্থাপনার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে বুঝায়। জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিল গেটসের মতো ডিমিং দ্যা সান প্রকল্পগুলো সফল হলে পৃথিবীর পানি সম্পদের ওপর এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী এবং বিপজ্জনক। প্রাকৃতিক পানিচক্রের (Water Cycle) ওপর এর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো:

১. বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তন

সূর্যের আলো কমে গেলে সমুদ্রের পানি বাষ্পীভবন (Evaporation) কমে যাবে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এর ফলে বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

মৌসুমি বায়ু ব্যাহত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ ও ভারতের মতো অঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর কোটি কোটি মানুষের কৃষি নির্ভর করে। জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং এই বায়ুপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করলে ভয়াবহ খরা দেখা দিতে পারে।

২. মেঘের ওপর নিয়ন্ত্রণ

মেরিন ক্লাউড ব্রাইটেনিং (MCB) প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি সমুদ্রের ওপরের মেঘকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়ানো বা কমানো সম্ভব। কিন্তু এক দেশে বৃষ্টি বাড়ালে অন্য দেশে বৃষ্টির অভাব বা খরা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিতে পারে।

৩. সমুদ্রের পানির অম্লতা (Ocean Acidification)

এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সোলার জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং শুধুমাত্র তাপমাত্রা কমায়, কিন্তু বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ($CO_2$) সরায় না। সমুদ্রের পানি বাতাস থেকে $CO_2$ শোষণ করতে থাকবে, ফলে পানি আরও অ্যাসিডিক বা অম্লীয় হয়ে উঠবে। এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান এবং মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

৪. হিমবাহ এবং মিঠা পানির উৎস

পৃথিবীর তাপমাত্রা কমলে হিমালয় বা আল্পস পর্বতমালার হিমবাহগুলো গলে যাওয়া ধীর হবে। এটি সাময়িকভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধ করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এটি অবশ্যই টেকসই সমাধান নয়। যদি হঠাৎ এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায় (Termination Shock), তবে হিমবাহগুলো এত দ্রুত গলবে যে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিবে।

৫. পানি নিয়ে ভূ-রাজনীতি (Hydro-politics)

পানি নিয়ে ভূ-রাজনীতি বা Hydro-politics বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ইস্যু। বিশেষ করে বড় নদীগুলোতে ড্যাম (বাঁধ) নির্মাণ কেবল পানি ব্যবস্থাপনা নয়, বরং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই খেলা চলে উজানের দেশ বনাম ভাটির দেশের মধ্যে। শক্তিশালী দেশ বনাম দুর্বল দেশের মধ্যে। নদীর পানি প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ সাধারণত উজানের দেশের হাতে থাকে। তারা যখন ড্যাম নির্মাণ করে, তখন ভাটির দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

নীলনদের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো হলো ইথিওপিয়া, মিশর ও সুদান। এখানে ইথিওপিয়ার Grand Ethiopian Renaissance Dam (GERD) নিয়ে মিশরের চরম উদ্বেগ। মিশর মনে করে এটি তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। আব্রাহামিক ধর্মে মিশরেরর নীল নদ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নাম। বর্তমানে নীল নদ আবারো নানা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় উঠে আসতে দেখা যাচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র নদীর সাথে সংশ্লিষ্ট চীন ও ভারত। এখানে চীন তিব্বত অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্রের ওপর বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করছে। ভারত ও বাংলাদেশের আশঙ্কা, এর ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। মেকং নদীর সাথে সংশ্লিষ্ট চীন, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম। এখানেও চীনের বাঁধ নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কৃষি ও মৎস্য শিল্প ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদীর সাথে সংশ্লিষ্ট দেশ হলো তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাক। তুরস্কের GAP Project এর অধীনে নির্মিত বাঁধগুলো সিরিয়া ও ইরাকের পানির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে বাঁধকে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে দেখা হয় না, একে ‘Water Weaponization’ বা পানির অস্ত্রায়ন হিসেবে গণ্য করা হয়। সিন্ধু পানি চুক্তির (ভারত-পাকিস্তান) মতো দীর্ঘমেয়াদী দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। আবার সেই চুক্তি ভঙ্গের শংকা নিয়েই বর্তমান ভারত-পাকিস্তান বড় যুদ্ধের হুমকি তৈরি হয়েছে।

টার্মিনেশন শকের মতো কোন কারণে প্রচণ্ড খড়া দেখা দিলে শক্তিধর দেশগুলো স্বাভাবিক পানির এই প্রবাহ বন্ধ করে দিবে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি অনেক নিচে চলে যাবে এবং বহু অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে। মুসলিম দেশগুলো খুব সহজেই এই টার্গেটের শিকার হতে পারে। তবে একটি ইন্টারপ্রিশেন থেকে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বাংলাদেশ হয়ত খড়া নয় বরং পানি অর্থাৎ বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির ফিতনায় পরার সম্ভাবনা বেশি।

খাবার পানি নিয়েও সংশয়

‘পিওরইটই পিওর না!’ শিরোনামে গত ৪ মে, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ভাইরাল হয়। প্রত্যেক কিট অর্ধেক পানি বিশুদ্ধ করতেও ব্যর্থ এমন ভয়াবহ তথ্য বের হয়ে আসে। এছাড়া পানি বিশুদ্ধ করার ক্ষেত্রে রিভার্স অসমোসিস (Reverse Osmosis) বা RO বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রযুক্তি। আর্সেনিক, ফ্লুরাইড, সিসা এবং পারদ দূর করতে এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করতে রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তি সক্ষম হলেও ক্ষতিকর উপাদানের সাথে সাথে এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় তামা, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানও ছেঁকে ফেলে। তাছাড়া এটি ১ লিটার পানি বিশুদ্ধ করতে গিয়ে প্রায় ৩-৪ লিটার পানি ড্রেন দিয়ে বের করে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে সব বাড়িতে রিভার্স অসমোসিসের মতো পানি বিশুদ্ধকরণ প্রযুক্তির দরকার হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমনভাবে ভয় দেখানো হয় যার ফলাফল হলো প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন পানি বিশুদ্ধকরণ মেশিন। কতটা বিশুদ্ধ হচ্ছে তা যাচাই করারও সময় আমাদের হয়না। মাঝখান থেকে পানির যে ন্যাচারাল পুষ্টিগুণ তা ঠিকই নষ্ট হয়ে যায় আর সেই পুষ্টিহীন পানিই প্রতিনিয়ত পান করি। বিষয়টি এমন- জীবাণুও নেই পুষ্টিও নেই। তবে দীর্ঘ সময় ধরে একেবারে খনিজবিহীন (Demineralized) পানি পান করলে শরীরে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব হতে পারে।

ভারতে ২০২৪ সালে রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তির উপর কড়াকড়ি আরোপ করার জন্য আইন তৈরি করা হয়। পুরোপুরি নিষিদ্ধ না হলেও এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। উন্নত বিশ্বেও এই প্রযুক্তি যাতে প্রয়োজনীয় খণিজ উপাদান নষ্ট না করে তার জন্য বিধিনিষেধ আছে।

বায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ

জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশ হলো বায়ুমণ্ডলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়া। বায়ুস্তরকে ব্যবহার করে পৃথিবীর তাপমাত্রা কমানোর এই প্রক্রিয়ায় বাতাসের গতিপ্রকৃতি এবং স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। নিচে বায়ুর ওপর এর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের দিকগুলো আলোচনা করা হলো:

১. স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক পরিবর্তন

SCoPEx বা এই ধরণের প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০-৫০ কিলোমিটার উপরের স্তর বা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার। বিজ্ঞানীরা এখানে সালফার বা ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কণা ছড়িয়ে দিয়ে একটি কৃত্রিম “আবরণ” তৈরি করতে চান। এটি সফল হলে বায়ুমণ্ডলের এই স্তরের তাপমাত্রা এবং ঘনত্বের পরিবর্তন ঘটবে, যা পৃথিবীর প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহকে (Air Currents) প্রভাবিত করবে।

২. জেট স্ট্রিম ও বায়ুপ্রবাহের গতিপথ

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বাতাস বয়ে নেওয়ার জন্য জেট স্ট্রিম (Jet Streams) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যের আলো কমলে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর সাথে বিষুবরেখার তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যেতে পারে। এর ফলে জেট স্ট্রিমের গতিপথ বদলে যেতে পারে, যা সরাসরি ঝড়, সাইক্লোন এবং মৌসুমী বায়ুর গতি পরিবর্তন করে দিবে। এর ফলে কোনো অঞ্চলে অস্বাভাবিক ঝড় আবার কোথাও বাতাসহীন গুমোট অবস্থা তৈরি হবে। আর এগুলো অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত হবে আবিষ্কৃত প্রযুক্তি দ্বারা যা অত্যন্ত বিপদজনক। ভেবে দেখবেন বর্তমানে এমন খবর অহরহ পাই কিনা এবং সেগুলো আসলেই প্রকৃতি প্রদত্ত নাকি কৃত্তিম?

৩. ওজোন স্তরের ক্ষতি

বায়ুমণ্ডলের ওপর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে গিয়ে ওজোন স্তরের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে যখন কৃত্রিম কণা (Aerosols) ছড়ানো হয়, তখন সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে ওজোন গ্যাস ($O_3$) ক্ষয় হতে পারে। ওজোন স্তর পাতলা হয়ে গেলে ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসবে, যা মানুষের ত্বকের ক্যানসার ও উদ্ভিদের ক্ষতি করবে, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে এবং জীব-বৈচিত্র নষ্ট হবে।

৪. আকাশ বা নীলিমা ম্লান হওয়া

বায়ুর ওপর এই নিয়ন্ত্রণের একটি দৃশ্যমান প্রভাব হবে আকাশের রং পরিবর্তন। প্রচুর পরিমাণে এরোসল কণা বাতাসে থাকলে আকাশের নীল রং ফিকে হয়ে আসবে। আকাশ কিছুটা সাদাটে বা ঘোলাটে দেখাবে। একেই বিজ্ঞানীরা “Dimming the Sun” বা সূর্যের আলো ম্লান হওয়া বলছেন। এ ধরনের কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সে সম্পর্কে মিডিয়া বা কোথাও কোন আপডেট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। নিয়মিত আকাশ পর্যবেক্ষণ করে নিজেরাই ধারনা নিতে পারি।

আবহাওয়া যুদ্ধ (Weather Warfare)

জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা কোন কল্পকাহিনী না। এটি যেমন বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণিত সত্য, তেমনি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত। সূর্যের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফল হলো বায়ু ও পানি সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেয়া যার অবধারিত পরিণতি হলো প্রকৃতির ফিতরাত নষ্ট করা এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সূচনা যার নাম আবহাওয়া যুদ্ধ (Weather Warfare) বা পরিবেশগত যুদ্ধ (Environmental Warfare)। যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহারের প্রধান দিকগুলো হলো:

➥ ক্লাউড সিডিং (Cloud Seeding) বা মেঘের ওপর রাসায়নিক ছিটিয়ে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় অতিবৃষ্টি বা বন্যা সৃষ্টি করা, যা শত্রুর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

➥ কোনো দেশের ওপর মেঘ পৌঁছানোর আগেই তা অন্য কোথাও নামিয়ে ফেলা। এতে শত্রু রাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদী খরা দেখা দিতে পারে, যা তাদের কৃষি ও অর্থনীতি ধ্বংস করে দিবে। এভাবে কৃত্তিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা সম্ভব।

➥ বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে নির্দিষ্ট গ্যাস বা কণা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্যের আলো কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে কমিয়ে দেওয়া বা ওজোন স্তরের ক্ষতি করা সম্ভব। এর ফলে আল্ট্রাভায়োলেট (UV) রশ্মির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে জনস্বাস্থ্য এবং গবাদি পশুর অপূরণীয় ক্ষতি করা যেতে পারে।

➥ এক দেশে বৃষ্টি নামাতে গিয়ে পাশের মিত্র দেশেও ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। কারণ জলবায়ুর কোনো সীমানা নেই, কোন পাসপোর্ট-ভিসা লাগেনা। পারমাণবিক যুদ্ধের মতো এটিও এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যেখানে উভয় পক্ষই জলবায়ুর ভারসাম্য হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

কারণ পানি সম্পদকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের “জলবায়ু রাজনীতি” শুরু হয়ে যাবে। শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের আবহাওয়া অনুকূলে রাখার জন্য আকাশ বা মেঘ নিয়ন্ত্রণ করলে প্রতিবেশী দেশগুলোর পানির অধিকার খর্ব হবে। একে অনেক বিশেষজ্ঞ “Weather Warfare” বা আবহাওয়া যুদ্ধের একটি হাতিয়ার হিসেবেও দেখছেন।

উদাহরণ: অপারেশন পোপায়

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় (১৯৬৭-১৯৭২) মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন পোপায়’ (Operation Popeye) পরিচালনা করেছিল। তারা ভিয়েতনামের ওপর সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে বর্ষা মৌসুমকে দীর্ঘায়িত করেছিল যাতে উত্তর ভিয়েতনামের সেনাদের রসদ সরবরাহের রাস্তা (Ho Chi Minh Trail) কর্দমাক্ত এবং চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক আইন ও নিষেধাজ্ঞা

পরিবেশগত যুদ্ধ প্রতিরোধে ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ “ENMOD Convention” (Environmental Modification Convention) গ্রহণ করে। যার মাধ্যমে পরিবেশকে (আবহাওয়া, ভূমিকম্প, সমুদ্র ইত্যাদি) ইচ্ছাকৃতভাবে বদলে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

বর্তমানে কোনো দেশ সরাসরি জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং-কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কথা স্বীকার না করলেও, অনেক দেশই নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করছে। একে “Dual-use Technology” বলা হয়—যা শান্তি রক্ষায় বা জলবায়ু পরিবর্তনে ব্যবহারের কথা বলা হলেও যুদ্ধের সময় ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা থেকেই যায়।

সর্বোপরি, জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পুরো পৃথিবীর আবহাওয়া বা জলবায়ুকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনা। একে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘অ্যানথ্রোপোজেনিক ক্লাইমেট কন্ট্রোল’ বলা হয়। যেমনভাবে আমরা এসি (AC) বা রিমোট দিয়ে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করি, বিজ্ঞানীরা ঠিক সেভাবেই পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি ‘রিমোট কন্ট্রোল’ হাতে নিতে চাইছেন। সূর্য, পানি ও বাতাসকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে প্রকৃতির একটি বিশাল এবং জটিল ইঞ্জিনকে নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করা, যার ফলাফল ইতিবাচক হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। আর এসব অপবৈজ্ঞানিক আবিস্কারের নেতিবাচক প্রভাবকে ক্লাইমেট চেইঞ্জ নামক অশ্ব ডিম্ব দিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। কারণ ক্লাইমেট চেইঞ্জই এই সভ্যতা ধ্বংস ও কল্পিত নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার নাম্বার ওয়ান হাতিয়ার যার প্রমাণসহ বিস্তারিত পাবেন এই লিংকে

লাইফস্টাইলের উপর প্রভাব

জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং বা কৃত্রিমভাবে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সফল হোক বা ব্যর্থ, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বা লাইফস্টাইলের ওপর সরাসরি এবং গভীর প্রভাব ফেলবে। আমাদের বেঁচে থাকার স্বাভাবিক পরিবেশকে বদলে দিতে পারে।

যদি স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে সালফার বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট ছড়ানো হয়, তবে আকাশের চিরচেনা রূপ বদলে যাবে। আকাশ তার গাঢ় নীল রঙ হারিয়ে কিছুটা সাদাটে বা ঘোলাটে হয়ে যাবে। দিনের বেলা সূর্যের তেজ কমে যাবে। এটি আপনার মেজাজ (Mood) এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ মানুষ সূর্যালোক থেকে ভিটামিন-ডি এবং আনন্দ পায়। এটি সম্প্রতি হচ্ছে কিনা তা আকাশ দেখে নিজেরাই পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কারণ আমরা জিও-ইঞ্জিনিয়ায়িংয়ের অগ্রগতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

কৃত্রিম খরা বা অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর ফলে বাজারে চাল, ডাল বা সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এরফলে আমাদের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস বাধ্য হয়ে পরিবর্তন করতে হতে পারে।

বায়ুমণ্ডলে কৃত্রিম কণা ছড়ানোর ফল হলো জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। যদিও এই কণাগুলো অনেক উঁচুতে ছড়ানো হয়, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এগুলো নিচের স্তরে নেমে ফুসফুসের জটিলতা বা শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে।

প্রকৃতির ওপর মানুষের এই খবরদারি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের “প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা” তৈরি করতে পারে। মানুষ হয়তো অনুভব করবে যে তারা কোনো প্রাকৃতিক গ্রহে নয়, বরং একটি বড় “ল্যাবরেটরিতে” বাস করছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তিতে প্রভাব ফেলে।

ধারনা করা যায় যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশেষ করে শহুরে মানুষদের চিরাচরিত জীবনযাপনের রীতি আমুল বদলে যাবে। এর ফুয়েল হিসেবে কাজ করবে জিও ইঞ্জিনিয়ারিং, যুদ্ধ সংঘাত, কৃত্তিম সংকট ইত্যাদি।

দুর্যোগ ও ফিতনা মোকাবিলায় করণীয়

মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। ধীরে ধীরে আবার প্রকৃতির দিকে ফিরে আসা শুরু করেছে। প্রকৃতিক খাবারের দিকে ঝুকছে। কিভাবে রান্না করে খেলে অধিক পুষ্টি পাওয়া যায় অথবা ঘরোয়া প্রকৃতিক পদ্ধতিতে কিভাবে নিজেই নিজের অসুখ সারা যায় সেগুলো সম্পর্কে জানার ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু হায় আফসোস! সবকিছু জানার পর বুঝা গেলো আমাদের বীজ হাইজ্যাক হয়ে গেছে! হাইব্রিড বা জিএমও খাবারে পুষ্টি নেই। যেভাবেই রান্না করেন বা খান না কেনো, কোনো লাভ নেই। বাড়ির ডাক্তার হিসেবে পরিচিত নিম গাছ হাইজ্যাক হয়ে গেছে। সূর্য, বাতাস, পানি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে অদৃশ্য এক শক্তির হাতে যা মানবসভ্যতার জন্য কল্যাণকর নয়। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কি করার আছে? জিও-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিশাল বিশাল প্রকল্পগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্ধারিত হয়। আমাদের কি করার আছে?

করণীয় অনেক কিছুর লিস্ট ধরিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু আমার কাছে প্রথম কাজই হলো চক্রান্ত বুঝা। যদি কুশিলবদের আসল চক্রান্ত ধরতে না পারা যায় তবে সব ব্যর্থ। চক্রান্ত বুঝে আসল শত্রুদের চিহ্নিত করার পর অন্তত একটা দলকে যদি ঐক্যবদ্ধ করা যায়, বাকি কাজগুলো আপনাআপনি হতে থাকবে। হয়ত মনে হতে পারে যে এগুলোতে উন্নত বিশ্বের উদ্যোগ, আমাদের কিছুই করার নেই! আসলে তাদের প্রতিনিধি দেশেও আছে। তাছাড়া উন্নত বিশ্বেও একটি শ্রেণী এখন ব্যাপক সোচ্ছার। সবখানে প্রতিবাদ। শুরু হয়েছে জিও ইঞ্জিনিয়ারিং, যুদ্ধ ও কৃত্তিম সংকটের বিরুদ্ধে, মোট কথা গ্লোবাল এলিটসদের বিরুদ্ধে। এজন্য নৈতিক বিতর্ক চালু রাখা দরকার। আমরা কি প্রকৃতির ফিতরাতকে মানুষের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত? দেশীয় খাদ্যশস্যের বিশাল ভান্ডারকে বিলুপ্ত হতে দিতে চাই? দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার জন্য কি প্রস্তুত? সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সচেতন জনমত। প্রযুক্তির নামে অদৃশ্য শক্তি যখন প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, তখন মানুষের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বরই পারে প্রকৃতির ফিতরাতকে ফিরিয়ে আনতে।

দুর্ভিক্ষ বা গ্রেট ট্রিবুলেশনের প্রস্তুতি

ইসলামি আকিদাহ ও হাদিসের আলোকপাত অনুযায়ী, শেষ জামানার কঠিন সময় বা দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় একজন মুমিনের প্রস্তুতি কেবল বস্তুগত নয়, বরং আত্মিক ও আমলি হওয়া জরুরি। এই সংকটময় সময়ে আমাদের করণীয়গুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:

আত্মিক ও আমলি প্রস্তুতি

দুর্ভিক্ষ বা ফেতনার সময় মানুষের ঈমান ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

➥ তাকওয়া ও ইস্তিগফার: কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহকে ভয় করলে তিনি অভাবনীয় উৎস থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেন। বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করা বৃষ্টি ও সচ্ছলতা আসার অন্যতম মাধ্যম।

➥ অল্পে তুষ্টি: বিলাসিতা বর্জন করে সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া। নবীজি (সা.) বলেছেন, মুমিনের জন্য সামান্য খাবারই যথেষ্ট।

➥ ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল: যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। অভাবের সময় মানুষের নৈতিকতা যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা।

➥ সূরা কাহাফের আমল: দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচতে এবং তার কৃত্রিম জান্নাত (খাদ্য ও সম্পদের প্রলোভন) থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সূরা কাহাফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করা এবং পড়া ও আমল করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

➥ তাসবিহ ও জিকির (আধ্যাত্মিক খাদ্য): হাদিস অনুযায়ী, দাজ্জালের আগমনের আগের তিন বছর তীব্র দুর্ভিক্ষ হবে। সাহাবায়ে কেরাম যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তখন মুমিনরা কীভাবে বেঁচে থাকবে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন: “তহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তকবির (আল্লাহু আকবার), তহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) তাদের খাবারের কাজ করবে।” (ইবনে মাজাহ) অর্থাৎ, আল্লাহ জিকিরের বরকতে মুমিনদের ক্ষুধা নিবারণ করবেন এবং শরীরে শক্তি দান করবেন।

বস্তুগত ও সামাজিক প্রস্তুতি

ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিক নয়, বরং বাস্তবসম্মত প্রস্তুতির শিক্ষা দেয়।

➥ কৃষি ও উৎপাদন: পতিত জমি ফেলে না রেখে খাদ্য উৎপাদনের চেষ্টা করা। নবীজি (সা.) গাছ লাগানো এবং চাষাবাদকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য করেছেন। সামান্য জমি থাকলে সেখানেও ফলমূল বা সবজি চাষের চেষ্টা করুন।

➥ পানি ও খাদ্যের অপচয় রোধ: সম্পদ ও খাবার অপচয় করা শয়তানের কাজ। সংকটের আগেই অপচয় বন্ধ করে সঞ্চয়ের অভ্যাস করা উচিত। পানির উৎস যেমন কুয়া বা টিউবওয়েল এবং প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো।

➥ পারস্পরিক সহযোগিতা: দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ স্বার্থপর হয়ে যায়। ইসলামি শিক্ষা হলো নিজের খাবারের একটি অংশ ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীকে দেওয়া। সামাজিক সংহতিই বড় দুর্যোগ মোকাবিলার শক্তি।

➥ ঋণমুক্ত থাকার চেষ্টা: কঠিন সময়ের আগে যতটা সম্ভব দেনা পরিশোধ করে রাখা ভালো, যাতে মানসিক চাপ কম থাকে।

➥ জীবনযাত্রায় পরিমিতিবোধ: বিলাসিতা ত্যাগ করে ন্যূনতম যা প্রয়োজন তাতে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস এখনই করা উচিত। অল্প খাবারে পেট ভরানোর মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

➥ সঞ্চয় ও মিতব্যয়িতা: সম্পদ অপচয় না করে ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংরক্ষণের অভ্যাস করা।

➥ খাদ্য নির্বাচন: বাজারের প্যাকেটজাত খাবার বর্জন, বড় কর্পোরেট কোম্পানীর খাবার নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। সকল প্রকার হাইব্রিড ও জিএমও খাবার চিহ্নিত করে সেগুলো খাবার তালিকা থেকে বাদ দিন। দেশীয় বীজের খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করুন।

➥ দাজ্জালের চিহ্ন (Mark of the Beast) বর্জন করা: বাইবেল অনুযায়ী অ্যান্টি-ক্রাইস্ট সবার কপালে বা হাতে একটি চিহ্ন (৬৬৬) নিতে বাধ্য করবে। এই চিহ্ন না নিলে কেনা-বেচা করা যাবে না। কিন্তু যারা এই চিহ্ন নেবে না, তারাই অনন্তকাল রক্ষা পাবে, যদিও পৃথিবীতে তারা চরম কষ্টের শিকার হবে। এক ডলারের নোটে দাজ্জালের চিহ্ন এতদিন দেখে আসছি। এবার প্রত্যেকের শরীরে দাজ্জালের চিহ্ন গেথে দেয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষের পর্যায়ে। শরীরে ইলেকট্রনিক চিপ বসানোর এই প্রযুক্তিকে বলা হয়ে ‘মাইক্রোচিপ ইমপ্লান্ট’। এজন্য RFID (Radio Frequency Identification) অথবা NFC (Near Field Communication) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এটি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মধ্যবর্তী চামড়ার নিচে ইনজেকশনের মাধ্যমে স্থাপন করে বাস্তবায়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

➥ নিরাপদ আশ্রয়গ্রহণ: ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্ম অনুযায়ী, দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ ও ভয়াবহ ধ্বংসের লক্ষণ দেখা দিলে গ্রাম, পাহাড় বা নির্জন স্থানে আশ্রয় গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

পরিশেষে, আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি। দুনিয়াবি প্রস্তুতি সর্বোচ্চ থাকবে, কিন্তু চূড়ান্ত ভরসা থাকবে কেবলই আল্লাহর ওপর। গ্রেট ট্রিবুলেশন থেকে বাঁচার উপায় কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কার বা ডুমসডে প্লেন নয়, বরং নিজের আত্মাকে প্রস্তুত রাখা। এই প্রস্তুতি কেবল দুর্ভিক্ষের ভয়ে নয়, বরং সুন্নাহর অনুসরণে হওয়া উচিত। কারণ সময়টি কেবল দুর্ভিক্ষের নয়, কেবল পেটের ক্ষুধা নয়, বরং ঈমানের পরীক্ষার। এই সময়ে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং অবিচল বিশ্বাস।

What do you think?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

GIPHY App Key not set. Please check settings

New World Order, World War 3 and New Map

নতুন বিশ্ব গড়ার মহাপরিকল্পনা, বাস্তবতা এবং পরিণতি